অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা
করলা খুবই পুষ্টিকর একটি খাবার। এটি অনেকেরই প্রিয় তরকারি। বিশেষ করে গরমের দিনে দুপুরের খাবারে করলা ভাজা, কিংবা করলার ঝোল শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই সবজিটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে বা ওজন কমাতে সাহায্য করে।
পুষ্টিবিদ তাসনীম আশিক বলেন, করলা স্বাদে তিতা হলেও এর উপকারিতা অনেক বেশি। প্রথমত করলা রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেক বেশি সহযোগিতা করে থাকে। অর্থাৎ রক্তে কোনোভাবেই গ্লুকোজের পরিমাণকে বাড়তে দেয় না। সে কারণে খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন একজন ডায়াবেটিস রোগীকে করলা রাখতে বলা হয়ে থাকে। কিন্তু যখনই কেউ প্রয়োজনের অতিরিক্ত করলা খাওয়া শুরু করেন, তখনই শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে শুরু করে।
অনেকেই ডায়াবেটিস কমানো বা দ্রুত ওজন ঝরাতে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে করলার রস খান। এ ছাড়া রান্নায় অতিরিক্ত করলা ব্যবহার করেন। চিকিৎসকদের মতে, এই অভ্যাস শরীরের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। অতিরিক্ত করলা খেলে কী কী শারীরিক সমস্যা হতে পারে, জেনে নিন।
রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া
করলার সব থেকে বড় গুণ হলো এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কমায়। কিন্তু আপনি যদি নিয়মিত সুগারের ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত মাত্রায় করলা বা করলার রস খান, তবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক নিচে নেমে যেতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হাইপোগ্লাইসেমিয়া’। এর ফলে হঠাৎ করে মাথা ঘোরা, শরীরে কাঁপুনি, বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং এমনকি রোগী অজ্ঞান পর্যন্ত হয়ে যেতে পারেন।
লিভার বা যকৃতের মারাত্মক ক্ষতি
করলার মধ্যে ‘মোমোরচারিন’ নামক এক ধরণের প্রোটিন থাকে। অতিরিক্ত মাত্রায় করলা খেলে এই উপাদানটি লিভারের এনজাইমগুলোর ক্ষরণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে লিভারের কোষে প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই অভ্যাস লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়, যাকে চিকিৎসকরা লিভার টক্সিসিটি বা যকৃতের ক্ষতি বলে অভিহিত করেন।
ডায়রিয়া ও পেটের তীব্র সমস্যা
করলাতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার ও ল্যাক্সেটিভ উপাদান থাকে। তবে অতিরিক্ত করলা খেলে পাকস্থলীর কার্যপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর ফলে পেটে তীব্র মোচড় দিয়ে ব্যথা, বদহজম, গ্যাসের সমস্যা এবং বারবার পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া হতে পারে। বিশেষ করে যাদের পেট সংবেদনশীল, তাদের অতিরিক্ত করলা খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
গর্ভবতী নারীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি
গর্ভবতী নারীদের জন্য করলা অতিরিক্ত খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। করলার মধ্যে থাকা কিছু সক্রিয় উপাদান জরায়ুকে সংকুচিত করতে পারে। এর ফলে গর্ভাবস্থায় রক্তপাত শুরু হতে পারে এবং চরম ক্ষেত্রে গর্ভপাতের মতো মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি থাকে। তাই গর্ভাবস্থায় ডায়েটে করলার রাখার আগে অবশ্যই গাইনিকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পুরুষ ও নারীদের প্রজনন ক্ষমতায় প্রভাব
প্রাণীদের ওপর করা কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত পরিমাণে করলার বীজ বা রস নিয়মিত খেলে তা প্রজনন হরমোনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি পুরুষদের শুক্রাণুর উৎপাদন এবং নারীদের ডিম্বাণু তৈরির প্রক্রিয়াকে সাময়িকভাবে ব্যাহত করতে পারে। যদিও মানুষের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন, তবুও এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন।
তাহলে প্রতিদিন কতটা উচ্ছে খাওয়া নিরাপদ?
পুষ্টিবিদদের মতে, সুস্থ থাকার জন্য সপ্তাহে ২ থেকে ৩ দিন করলার তরকারি বা ভাজা খাওয়া নিরাপদ। তবে আপনি যদি প্রতিদিন করলা রস খেতে চান, তবে তা যেন কোনোভাবেই ৩০ থেকে ৫০ মিলিলিটারের বেশি না হয়। করলা নিঃসন্দেহে একটি ঔষধি গুণসম্পন্ন সবজি, তবে তা পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো। নিজের শরীরকে সুস্থ রাখতে আজ থেকেই অতিরিক্ত করলার রস খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন এবং যেকোনো পুষ্টিকর খাবারই পরিমিত মাত্রায় গ্রহণ করুন।

ফিচার ডেস্ক