জ্বর হলেই হাসপাতালে ভিড় না করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
জ্বর হলেই হাসপাতালে ভিড় না করার পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জ্বর হলেই হাম হয়েছে ভেবে তাৎক্ষণিকভাবে রোগীকে আলাদা (আইসোলেশন) করার প্রয়োজন নেই। তবে চার দিন পর শরীরে র্যাশ (ফুসকুড়ি) দেখা দিলে তখন রোগীকে আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আজ রোববার (১২ এপ্রিল) সকাল ১০টা বাংলাদেশ মেডিকেল বিহস্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মিল্টন হলে কন্টিনিউইং মেডিকেল এডুকেশন সেশন (সিএমই) ও গোল টেবিল আলোচনায় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে হামের সংক্রমণ আবারও বাড়ছে। তারা দ্রুত টিকাদান কভারেজ বাড়ানো, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাউন্ড টেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা হামের বিস্তার রোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং কার্যকর কৌশল বাস্তবায়নের ওপর মতামত দেন।
অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) কর্মকর্তা ডা. লোবাবা শারমিন বলেন, হামে আক্রান্ত রোগীদের ডায়রিয়া হলে স্বাভাবিক সময়ের মতোই চিকিৎসা দিতে হবে। বাসায় রেখেও ওআরএস খাওয়ানোর মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তবে শিশু বেশি দুর্বল হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, আজকের এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য দুটি। প্রথমত, একই ছাতার নিচে একজন বিশেষজ্ঞকে একত্র করে একটি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করা। যদিও আলোচনা একটি সীমিত পরিসরে হচ্ছে, তবুও এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় উঠে আসছে, যা সবার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, এসব আলোচনার মূল বিষয়গুলো জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতিনিধিরাই প্রধান ভূমিকা পালন করবেন। তাদের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলো সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায়। সংক্রমণের অনেক পরে এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়, ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির অজান্তেই রোগটি ছড়িয়ে পড়ে।
এফ এম সিদ্দিকী বলেন, আজকের বিভিন্নজনের আলোচনায় এটা পরিষ্কার যে, টিকাদান কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও তার যথাযথ ফলাফল অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান নয়। কোথাও কোথাও টিকা না দিয়েই কাগজে-কলমে দেওয়ার তথ্য দেখানো হচ্ছে। এ বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, এই প্রশ্ন উত্থাপন করতে হবে।
ভিসি ডা. এফ এম সিদ্দিকী আরও বলেন, এই গোলটেবিল আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলো নথিভুক্ত করে প্রস্তাব আকারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, যেখানে অংশগ্রহণকারী সবার মতামত ও স্বাক্ষর থাকবে।
এ সময় ক্লিনিশিয়ান হিসেবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন বিএমইউর নবনিযুক্ত এই ভিসি। তিনি বলেন, পরীক্ষার ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা একটি বড় বিষয়। সঠিক সময়ের আগে নমুনা সংগ্রহ করা হলে অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত না-ও হতে পারে। এ বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ছয় মাসের আগেও হাম সংক্রমণ হচ্ছে, যা আগে ধারণা করা হতো না। এটি ইঙ্গিত করে যে মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা সব ক্ষেত্রে শিশুর মধ্যে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, এ পরিস্থিতিতে বুস্টার টিকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এজন্য গর্ভবতী মায়েদের ওপর বৃহৎ পরিসরে গবেষণা চালিয়ে তাঁদের প্রতিরোধক্ষমতার অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। গবেষণার ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে কিশোরী মেয়েদের জন্য অতিরিক্ত টিকা প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক হবে।
উপাচার্য এফ এম সিদ্দিকী আরও বলেন, এ ধরনের বৈজ্ঞানিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরা জরুরি। প্রতিটি মহামারি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। সতুরাং পরবর্তী বড় মহামারির জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত, তা বিবেচনার সময় এসেছে।
ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, এই বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো শুধু আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে তা বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। প্রস্তাবগুলো নীতিনির্ধারকদের কাছে পাঠিয়ে নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে। তবেই এ উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাবে।
অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা অংশ নেন। তারা শিশুদের মধ্যে হামের পুনরুত্থানের কারণ, বর্তমান পরিস্থিতি এবং এর প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক