ফ্যাটি লিভার ডিজিজ কী, কেন হয়?
চর্বিযুক্ত লিভারকে সাধারণত ফ্যাটি লিভার বলা হয়। এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ২৫৮১তম পর্বে কথা বলেছেন ডা. মো. ফখরুল আলম। বর্তমানে তিনি হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
প্রশ্ন : ফ্যাটি লিভার ডিজিজ আসলে কী?
উত্তর : ইদানীং আমাদের দেশে ফ্যাটি লিভার রোগ নিয়ে খুব কথাবার্তা হচ্ছে। অনেকেই চিন্তিত হয়ে পড়ছেন। আসলে এর বিষয়ে প্রত্যেকেরই জানা দরকার। ফ্যাটি মানে হলো চর্বি, অর্থাৎ লিভারের বা যকৃতের মধ্যে যদি চর্বি জমে যায় এবং অতিরিক্ত চর্বি জমে যায়, তখন একে আমরা ফ্যাটি লিভার বলি। আসলে ফ্যাটি লিভারের বিভিন্ন ধরনও রয়েছে। যেমন—ধরেন লিভারে শুধু চর্বি জমে যাওয়া। এটা একটা ধরন। একে আমরা বলি এনএফএলডি। লিভারের চর্বি জমে গিয়ে এখানে আবার লিভারের ক্ষত তৈরি হয়ে গেল। এটাও এক ধরনের সমস্যা। একে আমরা ন্যাশ বলি। এটা আরো বেড়ে গিয়ে সিরোসিসের দিকে চলে যায়।
প্রশ্ন : এর কি কোনো কারণ রয়েছে?
উত্তর : প্রতিটি রোগের পেছনেই তো আসলে কারণ রয়েছে। বাইরের দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের এ বিষয়ে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। বাইরের দেশে বা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে মদ পান করার অভ্যাস থাকে। এটি তাদের স্বাভাবিক সংস্কৃতির একটি অংশ। তাঁরা নিয়মিত মদ পান করেন। এই অ্যালকোহল কিন্তু লিভারে গিয়ে সমস্যা তৈরি করে। কেউ যদি নিয়মিতভাবে মদ্যপান করেন, এটি থেকে লিভারে অনেক চর্বি জমে যায়। এবং বিভিন্ন প্রদাহ তৈরি করে। লিভার নষ্ট হয়ে যায়। লিভার ক্যানসারও হয়ে যেতে পারে।
কাজেই অ্যালকোহল একটি ফ্যাটি লিভারের কারণ। তবে আমাদের দেশে কিন্তু তেমনটা নয়। আমাদের রুচি একটু ভিন্ন। সে জন্য আমাদের অ্যালকোহল ছাড়াও অন্য কারণে ফ্যাটি লিভার হয়। আমাদেরও এখন জীবনযাত্রার ধরন পাল্টে গেছে। আমরা আগে যেমন প্রচুর শাকসবজি, মাছ-মাংস খেতাম, এখন কিন্তু আমাদের জীবনযাত্রার ধরন পাল্টেছে। আমরা একটু শহরমুখী হয়ে যাচ্ছি। এখানে খাবারের ধরনও পাল্টে গেছে। শাকসবজি আমাদের খাবারের টেবিল থেকে অনেকটা কমে যাচ্ছে। আমরা চর্বিজাতীয় খাবারের দিকে বেশি ঝুঁকছি। এতে আমরা বেশি বেশি স্থূলকায় হয়ে যাচ্ছি। এতে এই যে শরীরে চর্বি জমছে, লিভারেরও চর্বি জমছে। লিভারও তো এর অংশ। এর জন্য ফ্যাটি লিভার হচ্ছে।
আরেকটি বিষয় খেয়াল করুন, আমাদের স্কুলগুলোতে, হাইস্কুল, প্রাথমিক স্কুলে খেলার কোনো মাঠ নেই। এখানে সব কারাগারের মতো বন্দি। আর বাচ্চারা টিফিন বক্সে ফাস্টফুড জাতীয় খাবার বেশি নিয়ে যায়। তাই এই যে খাবারগুলো খাচ্ছে এ থেকে কিন্তু বাচ্চারাও স্থূলকায় হয়ে যায়। এই বাচ্চা যখন বড় হবে, সে-ও কিন্তু একজন ফ্যাটি লিভারের রোগী হয়ে যাবে। কাজেই এগুলোই মূল কারণ।
এ ছাড়া কিছু কিছু পদ্ধতিগত বা সিস্টেমিক রোগ রয়েছে, যেমন—হার্টের সমস্যা, ডায়াবেটিস অথবা রক্তের চর্বি বেড়ে যাওয়া। আবার কেউ বংশগতভাবে মোটা, তারা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন : কী কারণে হয়েছে, সেটি বোঝার উপায় কী?
উত্তর : ফ্যাটি লিভার আছে কি-না, এটি বোঝার জন্য আমরা প্রথমেই তাকে পরীক্ষা করে দেখি যে তার ওজন স্বাভাবিক রয়েছে, নাকি এর চেয়ে বেশি রয়েছে। এখন হয়তো দেখা যাচ্ছে উনি স্থূলকায়। ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে অন্যান্য রোগও থাকে। যেমন—রক্তে চর্বি, ডায়াবেটিস বা অন্যান্য মেটাবলিক সিনড্রোম আছে কি না, বংশে অন্যরা কেমন, তাদের ফ্যাটি লিভার আছে কি না। অন্যরাও স্থূলকায় কি-না, সেগুলোও আমরা দেখি। দেখার পর দেখা গেল যে আছে। তখন দেখা যায় যে এটা ফ্যাটি লিভার।
তখন আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিকে আগাই। পরীক্ষার মধ্যে সবচেয়ে সহজে যেটা আমরা ধরতে পারি, সেটি হলো আলট্রাসনোগ্রাফি। একটি আলট্রাসনোগ্রাফি করলেই বোঝা যায় লিভারে চর্বির পরিমাণ কতটুকু আছে। তবে এখানে অর্ধেকের বেশি লিভার এখানে যুক্ত হতে হবে। আর বাকিটা অন্য পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা যায়, যেমন সিটি স্ক্যান, এমআরআই। তবে সেগুলো অনেক ব্যয়বহুল পরীক্ষা। সেগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু আলট্রাসনোগ্রামই যথেষ্ট।
প্রশ্ন : সাধারণত ফ্যাটি লিভারের তো কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। রোগীরা যখন আসে, তখন কীভাবে নির্ণয় করেন ফ্যাটি লিভারের সমস্যা হয়েছে?
উত্তর : আসলেই। বেশির ভাগ রোগী আমাদের কাছে যখন আসে, দেখা যায় তাদের লক্ষণ নেই। তবে তারা তাহলে কীভাবে আসে। অন্য একটা রোগের কারণে আলট্রসনোগ্রাফি করলে হয়তো ধরা পড়ে যে তার ফ্যাটি লিভার রয়েছে। তখনই বলে আমার তো লিভারে চর্বি জমে গেছে। কী করি? আমরা তখন আরো কিছু পরীক্ষা করাই, সেগুলো করলেও বোঝা যায়। এগুলো পরীক্ষার পর আমরা নিশ্চিত হই। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় আগে ধরাই পড়ল না, একসময় লিভারের জটিল রোগ নিয়ে আসে। তত দিনে হয়তো অনেকটা ক্ষত হয়ে গেছে। লিভার সিরোসিসের পর্যায়ে চলে গেছে। সে ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়।

ফিচার ডেস্ক