চোখ ঝাপসা, ত্বক খসখসে? শরীরে ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতি নয় তো
চোখে ঝাপসা দেখা, অন্ধকারে দেখতে সমস্যা হওয়া কিংবা ত্বক হঠাৎ অতিরিক্ত শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যাওয়া—এসব সমস্যাকে অনেকেই সাধারণ বলে এড়িয়ে যান। অথচ শরীরে ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতি থাকলেও দেখা দিতে পারে এমন কিছু লক্ষণ। দৃষ্টিশক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থেকে শুরু করে ত্বকের সুস্থতা এবং প্রজননস্বাস্থ্য—শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রয়েছে এই ভিটামিনের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভিটামিন ‘এ’-র অভাব। কিন্তু আমরা অনেকেই দৈনন্দিন ব্যস্ততায় এই ভিটামিনের ঘাটতির প্রাথমিক লক্ষণগুলো এড়িয়ে যাই। শরীরে ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতির প্রধান লক্ষণগুলো কী কী, কীভাবে বুঝবেন আপনি এই সমস্যায় ভুগছেন এবং কোন কোন খাবারের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব—তা নিয়ে একটি বিস্তারিত বিশেষ প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
শরীরে ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতির ৭ লক্ষণ
রাতকানা রোগ
ভিটামিন ‘এ’-র অভাবের সবচেয়ে প্রথম ও প্রাথমিক স্পষ্ট লক্ষণ হলো রাতকানা রোগ। আলো কমে গেলে বা অন্ধকারে চোখে কম দেখা বা ঝাপসা দেখার সমস্যা দেখা দেয়। পর্যাপ্ত ভিটামিন ‘এ’-র অভাবে চোখের রেটিনায় ‘রোডোপসিন’ নামক রঞ্জক তৈরি হতে পারে না, যার ফলে চোখের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া
ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতি দেখা দিলে চোখের পানি তৈরি হওয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে চোখ শুষ্ক বা খসখসে লাগে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় জিরোফথ্যালমিয়া বলা হয়। দীর্ঘদিন এই অবস্থা বজায় থাকলে কর্নিয়ায় ঘা বা আলসার পর্যন্ত হতে পারে, যা স্থায়ী অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যায়।
ত্বক হয়ে ওঠে শুষ্ক ও খসখসে
ত্বকের কোষগুলোর পুনর্গঠন ও আর্দ্রতা বজায় রাখতে ভিটামিন ‘এ’ জাদুর মতো কাজ করে। শরীরে এর ঘাটতি হলে ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক, প্রাণহীন ও চামড়া খসখসে হয়ে পড়ে। অনেকেই একজিমা বা ত্বকের চরম শুষ্কতায় ভুগে থাকেন।
ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া
শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে বা আঘাত পেলে যদি ক্ষতস্থান শুকাতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে, তবে তা ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতির কারণে হতে পারে। কোলাজেন তৈরিতে এই ভিটামিনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
বারবার সংক্রমণ হওয়া
ভিটামিন ‘এ’-কে বলা হয় শরীরের ‘অ্যান্টি-ইনফেক্টিভ ভিটামিন’। এটি ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখে। এর অভাবে গলা, বুক বা পরিপাকতন্ত্রে বারবার ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে।
মুখে ব্রণ বা ফুসকুড়ির সমস্যা
ত্বকের ক্ষতিকর টিস্যু পুনর্গঠনে ভিটামিন ‘এ’ কাজ করে। শরীরে এর অভাব ঘটলে ত্বকে হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মুখে অনবরত তীব্র ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়।
শিশুদের বৃদ্ধি ও প্রজননস্বাস্থ্যে প্রভাব
গর্ভধারণের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরেই ভিটামিন ‘এ’ জরুরি। এই ভিটামিনের তীব্র ঘাটতি প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এ ছাড়া বাড়ন্ত শিশুদের শরীরে এর অভাব হলে তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
কোন খাবারে মিলবে ভিটামিন ‘এ’?
খাদ্যতালিকায় কিছু নির্দিষ্ট খাবার রাখলেই ভিটামিন ‘এ’-র চাহিদা পূরণে সহায়তা পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ—দুই ধরনের উৎসই।
উদ্ভিজ্জ উৎসের মধ্যে গাজর, মিষ্টি আলু, মিষ্টি কুমড়া, টমেটো, পালং শাক, নটে শাক, মেথি শাক ও ব্রকলি উল্লেখযোগ্য। এসব খাবারে থাকা বিটা-ক্যারোটিন শরীরে প্রয়োজন অনুযায়ী ভিটামিন ‘এ’-তে রূপান্তরিত হয়। এ ছাড়া পাকা পেঁপে, আম, কাঁঠাল ও তরমুজসহ বিভিন্ন রঙিন ফলও খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
প্রাণিজ উৎসের মধ্যে ডিমের কুসুম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এবং কলিজায় ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়। এ ছাড়া সামুদ্রিক মাছ (ছোট মৌরলা মাছ, স্যালমন বা কড লিভার অয়েল ও রুই-কাতলার তেলও এর উৎস হতে পারে। খাসি বা মুরগির কলিজায় উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ বিদ্যমান।
রান্নার সঠিক নিয়ম (ফ্যাট বা তেলের উপস্থিতি)
যেহেতু ভিটামিন ‘এ’ একটি ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিন, তাই সবুজ শাকসবজি বা গাজর রান্নার সময় সামান্য তেল বা ঘি ব্যবহার করা উচিত। তেল বা ফ্যাটের সঙ্গে খেলে শরীর খুব সহজে এই ভিটামিন শোষণ করতে পারে।
সতর্কতা
প্রাকৃতিক খাবার থেকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ সাধারণত নিরাপদ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের ইচ্ছায় উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট বা ক্যাপসুল খাওয়া ঠিক নয়। অতিরিক্ত ভিটামিন ‘এ’ শরীরে জমে বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে এবং লিভারের ক্ষতিসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই চোখে ঝাপসা দেখা, অন্ধকারে দেখতে সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী চোখ শুষ্ক থাকা বা ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে শুধু ভিটামিনের ঘাটতি ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। সুষম খাদ্যাভ্যাসই হতে পারে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করার সবচেয়ে ভালো উপায়।

ফিচার ডেস্ক