অস্টিওপরোসিস কী?
অস্টিওপরোসিস হাড়ের একটি রোগ। এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিনের ২৫০৬তম পর্বে এ বিষয়ে কথা বলেছেন ডা. মো. ইউসুফ আলী। বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অর্থোপেডিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
প্রশ্ন : অস্টিওপরোসিসটি কী?
উত্তর : অস্টিও মানে হলো হাড়। পরোসিস হলো ছিদ্র ছিদ্র হয়ে যাওয়া। ঝালি বা ঝাঁঝরের মধ্যে যেমন অনেক ছিদ্র থাকে। তেমনি হয়ে যাওয়া। স্বাভাবিক হাড় যখন ছিদ্র ছিদ্র হয়ে যায়। সেটাকে অস্টিওপরোসিস বলে। আরো স্বাভাবিক বা সাবলীল ভাষায় যদি বলতে চাই, সেটা হলো কাঠের ভেতরে ঘুণ পোকা যেমন ঢোকে, দেখা যায় অল্প আঘাতে বা অল্প চাপে সেটা ভেঙে যায়। ঠিক এ রকম আমাদের হাড়গুলো হয়।
অস্টিওপরোসিসের কথা বলার আগে হাড়ের গঠন নিয়ে একটু বলে নিই। এটার সাথে গঠনের একটি বড় সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের যখন জন্ম হয়, আমাদের প্রথমে যে হাড়গুলো থাকে, এগুলো আসলে হাড় নয়, তরুণাস্থি। এই তরুণাস্থিতে যখন ক্যালসিয়াম ও ফসফেট ডিপোজিট হয়। ভিটামিন ডিয়ের একটি ভূমিকা আছে। এগুলো আস্তে আস্তে দেখা যায় হাড় গঠন করতে থাকে। এটা দেখা যায় ২৪-২৫ বছর পর্যন্ত শেষ হয়ে যায়। আর এই হাড় গঠনের জন্য কিছু পদ্ধতি আছে। এর ভেতরে কিছু ইনফ্লুয়েনশিয়াল ফেক্টর হিসেবে কাজ করে। এর মধ্যে হরমোন কিছু আছে, খাবার দাবারের অভ্যাস আছে, এগুলো হাড় গঠনের সাথে সম্পর্কিত। এখানে দুটো কোষ মূলত দায়ী। অস্টিওব্লাস্ট আর অস্টিওক্লাস্ট। অস্টিওব্লাস্ট হাড় তৈরি করে। অস্টিওক্লাস্টের কাজ হলো হাড় ক্ষয় করে। ক্ষয়েরও প্রয়োজন আছে।যেমন আমাদের হাড় ভেঙে যায় জোড়া লাগে,সেইখানে অন্য হাড়ের সাথে জোড়া লেগে মোটা হয়ে থাকে। সেই অস্টিওক্লাস্ট সেটাকে রিমডেলিং করে। অতিরিক্ত হাড়গুলোকে খেয়ে ফেলে। এটিও একটি দরকারি জিনিস। এর মধ্যে যখনই ভারসাম্য নষ্ট হয়,তখনই অস্টিওপরোসিসটা হয়। ৩৫ বা ৪০ বয়স পর্যন্ত অস্টিও ব্লাসটিজ কাজটি অনেক বেশি একটিভ থাকে। এর জন্য দেখা যায় হাড়ের গঠনটি তখন হতে থাকে। হাড়ের গঠনের যেই সময়টায় সেখানে যে যত বেশি হাড় গঠন করে নিতে পারে সে তত বেশি সুবিধা পাবে। অস্টিওপরোসিস আমরা দুই ধরনের বলে থাকি। একোয়ার্ড। আরেকটি হলো সাধারণত সবার যেটা হয়, প্রাইমারি অস্টিওপরোসিস, সেকেন্ডারি অস্টিওপরোসিস। রোগ সম্পর্কিত বা অভ্যাসগতভাবে যেটা হয়ে থাকে সেটি হলো সেকেন্ডারি অস্টিওপরোসিস। যেমন আমরা প্লাস্টার করে রাখি। প্রাইমারি অস্টিওপরোসিস আবার দুই ধরনের। টাইপ ওয়ান। টাইপ টু। এটা সাধারণত নারীদের হরমোন সম্পর্কিত। নারীদের ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। তখন শরীরে একটি হরমোন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়।
হাড়ের গঠন ধরে রাখার জন্য খুবই দরকারি। তখন দেখা যায় ৪৪ বা ৪৫ বছর পর যখন ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায় প্রথম ১০ বছরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ভাগ হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। যদি আগে থেকে এটা প্রতিরোধ না করা যায়, বা হাড়ের গঠনের জন্য কোনো ওষুধ দেওয়া না হয়, তাহলে দেখা যায় তারা খুব অস্বাভাবিক হয়ে যায়।
আর টাইপ টু যেটা, এটা সাধারণত বয়সের সাথে হয়ে থাকে। ৭০-৭৫ বছর বয়সে। সেটা পুরুষ নারী সবার জন্যই।
প্রশ্ন : অস্টিওপরোসিসের লক্ষণ কী আছে?
উত্তর : এ বিষয়ে আমাদের পরামর্শ হলো যখন ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায়, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কিছু ওষুধ খেয়ে নেওয়া। তাহলে প্রথম ১০ বছরে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ যে ক্ষতি হয়ে যায়, সেটি আর হবে না। অস্টিওপরোসিস দিয়ে যে ক্ষতি হওয়ার কথা সেটা হবে না।
আসলে লক্ষণ কিছু তো অবশ্যই আছে। তবে বেশির ভাগ হলো অস্টিওপরোসিসের কারণে সমস্যা হওয়ার পর আমাদের কাছে আসে। যেমন নারীদের সত্তরের পর যে ফ্যাকচারগুলো হয় তার ভিতরে অস্টিওপরোসিস হলো প্রধান কারণ। সামান্য আঘাতে সমস্যা হয়। যেমন রিকশায় যাচ্ছে। সামান্য আঘাত লাগছে, মেরুদণ্ডের একটি হাড় ভেঙে চুপসে গেল। সেটা আসলে আগে থেকেই নরম হয়ে গিয়েছিল। তারপর দেখা যায় ফ্লোরে বা টয়লেটে হঠাৎ করে পা পিছলে পড়ে গেল, দেখা গেল কোমরের হাড়টা ভেঙে গেল। যার জন্য দেখা যায় এই জিনিসগুলো হওয়ার পরই সাধারণত আসে।
অস্টিওপোরোসিসের জন্য এর আগে থেকেও কিছু লক্ষণ বলতে পারি, সেটি হলো, সারা শরীরে মনে হবে একটু ব্যথা। হাড়গুলোতে একটু একটু ব্যথা হবে। বয়স বাড়লে এমন হতে পারে। তখন বুঝতে পারে হাড় নরম হয়ে যাচ্ছে। তখন এই সমস্যা হয়।
আর কিছু অভ্যাস আছে যেগুলো এড়িয়ে গেলে অস্টিওপরোসিস এড়িয়ে যেতে পারি। যেমন ধূমপান একটি। এরপর হলো মদ্যপান। আরেকটি হলো ব্যায়াম। ব্যায়াম আজকাল প্রায় করাই হয় না। বাসায় যায়, চেম্বারে যায়, অফিসে যায়।
আরেকটি জিনিস রয়েছে আমরা সবসময় গ্যাসট্রিক গ্যাসট্রিক বলে থাকি। সবসময় দোকানে যাই, বলি ভাই একটি গ্যাসট্রিকের ওষুধ দেন। এই জিনিসটি যদি দীর্ঘদিন খাওয়া হয়, সেও ওষুধও অস্টিওপরোসিসের কারণ। আমরা অনেকেই জানি না। এটি একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করে।
একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ৬০ লাখ লোক অস্টিওপরোসিসের সমস্যায় ভোগে। দেখা যাবে ২০৫০ সালে এটি প্রায় ৬০ লাখে পৌঁছে যাবে। আমরা যদি একটু সচেতন হই তাহলে এটা প্রতিরোধ করা যায়।

ফিচার ডেস্ক