কোরবানির ঈদ ও লাল মাংসের ভালো-মন্দ
সামনে কোরবানির ঈদ। চলছে ঈদের প্রস্তুতি। কোরবানির হাট জমে উঠেছে। গরু, খাসি কিনে ফেলেছেন অনেকে। আজ-কালের ভেতর কিনবেন কেউ কেউ।
ঈদের আনন্দে পড়বে লাল মাংস খাওয়ার ধুম। লাল মাংসে উপকারিতার পাশাপাশি রয়েছে অপকারিতা বা ঝুঁকিও। গরু, মহিষ, খাসি, ভেড়া প্রভৃতি স্তন্যপায়ী পশুর মাংসকে রেড মিট বা লাল মাংস বলে। কারণ, এই মাংসগুলোতে একটু বেশি মায়োগ্লোবিন থাকে। এতে এর রং লাল হয়।
লাল মাংসে উপকার রয়েছে। রয়েছে অনেক ঝুঁকিও। লাল মাংস প্রোটিনের সমৃদ্ধ উৎস। আবার এগুলোতে সম্পৃক্ত চর্বি (স্যাচুরেটেড ফ্যাট) থাকে উঁচু মাত্রায়। থাকে প্রচুর খারাপ কোলেস্টেরলও।
লাল মাংসের উপকার
লাল মাংস প্রোটিনের সমৃদ্ধ উৎস। শরীরের বৃদ্ধি সাধন, ক্ষয়পূরণ ও শরীর গঠনে লাল মাংসের ভূমিকা অপরিসীম। দেহের অস্থি, পেশি, দাঁত, নখ, নানা দেহযন্ত্র প্রোটিন দিয়ে তৈরি। প্রোটিন থেকে তৈরি হয় অ্যান্টিবডি। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধে কাজ লাগে। হরমোন তৈরিতেও প্রয়োজন এই প্রোটিনের। লাল মাংসে থাকে প্রচুর পরিমাণ আয়রন, ভিটামিন এ, বি, জিংক, ফসফরাস, সেলেনিয়াম প্রভৃতি খাদ্যোপাদান। তাই শরীরের জন্য লাল মাংসের প্রয়োজন রয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন ১০০ গ্রাম লাল মাংস শরীরের জন্য যথেষ্ট। ১০০ গ্রাম মানে দুই-তিন টুকরা মাংস। এর বেশি হলেই কিন্তু ক্ষতি।
ক্ষতিকর দিক
লাল মাংসের প্রধান ক্ষতি হলো এর উচ্চমাত্রার ট্রাইগ্লিসারাইড ও এলডিএল। এটি ক্ষতিকর কোলেস্টেরল হিসেবে পরিচিত। এই কোলেস্টেরল ধমনির প্রাচীর পুরু করে হৎপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়। এভাবে একপর্যায়ে রক্তনালিতে ব্লক তৈরি হয়। এটি হদরোগের অন্যতম কারণ হয়ে দেখা দেয়। এ ছাড়া এর ক্ষতিকর কোলেস্টেরল স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক প্রভৃতি রোগেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
লাল মাংসে বিশেষ ধরনের ইনফ্লামেটরি যৌগ থাকে। এটি পাকস্থলীর প্রদাহের জন্য দায়ী। এই যৌগ পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের ক্যানসারের জন্যও দায়ী। ফুসফুস, কোলন, প্রোস্টেট ও স্তন ক্যানসারেও ভূমিকা রাখে লাল মাংস। প্রতিদিন একশ গ্রামের ওপর যত বেশি লাল মাংস খাওয়া হবে, এসবের ঝুঁকি ততই বাড়বে। অতিরিক্ত লাল মাংস গাউট, আর্থ্রাইটিস, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেপটিক আলসার, পিত্ত পাথর, প্যানক্রিয়াসের প্রদাহ, কিডনি রোগ প্রভৃতি সৃষ্টি করতে পারে। গরুর মাংসে থাকতে পারে টিনিয়া সোলিয়াস নামে বিশেষ এক ধরনের কৃমিজাতীয় পরজীবী। ঠিকভাবে মাংস সেদ্ধ না হলে এই কৃমিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শিক কাবাব, বারবিকিউ খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
ভালো থাকতে হলে
• ভালো থাকার উপায় হলো যথাসম্ভব লাল মাংস কম খাওয়া।
• কোরবানির পর মাংস কাটার সময় যতটা সম্ভব চর্বি কেটে বাদ দিন।
• রান্নার সময় মাংসের গায়ে লেগে থাকা জমাট চর্বি পুরোটাই তুলে ফেলুন। বিশেষ পদ্ধতিতে মাংস সেদ্ধ করে চর্বি ঝরিয়ে নিতে পারেন।
• কোরবানির পর যত দ্রুত সম্ভব মাংস চুলায় বসান। কাঁচা মাংসে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয় খুব দ্রুত। আর ফ্রিজে রাখতে চাইলে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে যত দ্রুত সম্ভব মাংস সংরক্ষণ করুন।
• খাদ্যতালিকায় আঁশ বা ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার রাখুন যত বেশি সম্ভব। সালাদ, ফল, ইসুবগুলের ভুসি, নানারকম সবজি—এগুলো হলো উচ্চ আঁশের উৎস। এসব খাবার চর্বি হজমে বাধা দেয় এবং কোষ্ঠ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। এতে লাল মাংসের ক্ষতিকর টক্সিন অন্ত্র থেকে সরে যায়, খারাপ কোলেস্টেরলও দূর হয়।
• ঈদের খাবারে নানরুটি, কেক, পরোটা, ফ্রাই বা অন্য যেকোনো ফাস্টফুড পরিহার করুন। টানা কয়েক দিন লাল মাংস না খেয়ে বিরতি দিন। মাঝেমধ্যে সবজি বা মাছ খান।
• প্রচুর পানি পান করুন। খাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পর পানি পান করুন।
• যাঁরা আলসার, কোষ্ঠকাঠিন্য, এনালফিশার ও পাইলসজাতীয় রোগে ভুগছেন, তাঁরা বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করুন। মাংস অল্প পরিমাণ খান। প্রতিদিন প্রচুর পানি, শরবত বা ফলের রস, ইসুবগুলের ভুসি ও আঁশযুক্ত খাবার খান।
• গাউটে আক্রান্ত রোগী, যাঁদের রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বেশি কিংবা যাঁরা কিডনি ফেউলিউরের রোগী, তাঁদের জন্য লাল মাংস ক্ষতিকর। প্রতিদিন ৩০ গ্রামের বেশি প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণ করা তাঁদের জন্য নিষেধ। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ঈদ সবার ভালো কাটুক। নিরাপদ হোক উৎসবের আনন্দ।
লেখক : রেসিডেন্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল