নীল নদের ব-দ্বীপে মাটির নিচে মিলল ২৬০০ বছরের পুরোনো স্থাপনা
মিসরের নীল নদের ব-দ্বীপের তলদেশে কাদা ও পানির নিচে চাপা পড়ে থাকা ২ হাজার ৬০০ বছরেরও বেশি পুরোনো একটি বিশাল প্রাচীন কাঠামো আবিষ্কার করেছেন গবেষকরা। প্রাচীন মিসরীয় কারিগর ও স্থপতিরা কীভাবে নরম মাটি এবং ভূগর্ভস্থ পানির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উন্নত প্রকৌশল কৌশলে ভবন নির্মাণ করতেন, এই আবিষ্কার তার এক অনন্য প্রমাণ হাজির করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংবাদমাধ্যম ‘গালফ নিউজের’ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
উত্তর-পশ্চিম নীল নদের বদ্বীপের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট ‘টেল এল-ফারাইন’ এলাকায় কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি, রিমোট সেন্সিং এবং ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক সমীক্ষার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক আবিষ্কার করা হয়েছে। ‘অ্যাক্টা জিওফিজিকা’ নামক বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ইউরোপীয় স্যাটেলাইট ‘সেন্টিনেল-১’ এর রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূপৃষ্ঠের সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়। এর মাধ্যমেই বুটো অঞ্চলের একটি প্রাচীন ঢিবির নিচে ১২৮ মিটার দীর্ঘ ও ৬২ মিটার প্রশস্ত একটি ভূগর্ভস্থ কাঠামোর সন্ধান পাওয়া যায়।
পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা যায়, ওপরের স্তরে টলেমাইক এবং রোমান যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। তবে এর প্রায় ৩ থেকে ৬ মিটার গভীরে মিসরের ২৬তম রাজবংশ বা ‘সাইট পিরিয়ড’ (৬৮৮-৫২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) আমলের একটি বিশাল মাডব্রিক বা রোদে পোড়ানো ইটের কাঠামো রয়েছে। ভবনটি সম্পর্কে বিস্তারিত নিশ্চিত হওয়া না গেলেও গবেষকদের ধারণা এটি কোনো রাজসমাধি, পুরোহিতদের বাসভবন কিংবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত স্থাপনা ছিল।
খননকাজে মোটা মাডব্রিকের দেওয়াল এবং প্রাচীন মিসরীয়দের কবরে মৃত ব্যক্তির পরকালের সেবায় ব্যবহৃত ‘উশাবতি’ ছোট মূর্তি পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রাচীন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবতা ‘থথ’ এর প্রতীকস্বরূপ চকচকে সিরামিকের তৈরি একটি ছোট বাবুন মূর্তি এবং পশুর রক্তের অবশিষ্টাংশযুক্ত খোদাই করা একটি চুনাপাথরের বেদিও উদ্ধার করা হয়েছে।
ভূগর্ভস্থ প্রকৌশলের অনন্য নিদর্শন
গবেষকদের সবচেয়ে বড় বিস্ময় জাগিয়েছে ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ মিটার গভীরে পাওয়া পরিষ্কার বালুর একটি পুরু স্তর। গবেষক দলটি একে ‘আবিষ্কারের ভেতর আরেকটি আবিষ্কার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, নীল ব-দ্বীপের মাটি কাদাযুক্ত হওয়ায় অতিরিক্ত আর্দ্রতায় ফুলে ওঠে এবং শুষ্ক মৌসুমে সংকুচিত হয়, যা ভারি ভবন নির্মাণের জন্য বড় বাধা। প্রাচীন স্থপতিরা এই প্রাকৃতিক ঝুঁকি এড়াতে ভবনের নিচে সুকৌশলে বালুর স্তর ব্যবহার করেছিলেন, যা ওজনকে সমভাবে বণ্টন করতে, ভূগর্ভস্থ পানি নিষ্কাশনে এবং মাটির চলাচল কমাতে সাহায্য করেছিল। পাশাপাশি এই বালুর স্তর ইটের ভেতর আর্দ্রতা প্রবেশ রোধ করে হাজার হাজার বছর ধরে কাঠামোটিকে অক্ষত রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
বুটোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বুটো ছিল প্রাচীন মিসরের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র। ২৬তম রাজবংশের শাসনামলে বিদেশি আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে দেশীয় শাসকরা ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পর এই অঞ্চলের পুনরুত্থান ঘটে। সাইস শহরের শাসকরা নীল ব-দ্বীপ জুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় কেন্দ্র ও পবিত্র স্থানগুলো পুনরুদ্ধারে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছিলেন। আধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও ভূশারীরিক সমীক্ষার সাহায্যে দীর্ঘকাল ধরে লুকিয়ে থাকা এই প্রাচীন স্থাপত্যের সন্ধান মেলায় প্রাচীন মিসরীয়দের নির্মাণশৈলী সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক