প্লেনে ৩৫ হাজার ফুট ওপরে গরম খাবার আসে কোথা থেকে?
উড়োজাহাজে দীর্ঘ যাত্রায় জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় হয়তো আপনার সামনে এসে দাঁড়ায় খাবারের ট্রলি। কেবিন ক্রু জানতে চান, চিকেন নাকি ফিশ- কোনটি খাবেন? কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবারের ট্রে চলে আসে আপনার সামনে। তাতে থাকে ভাত, মাংস, সবজি, সালাদ, রুটি কিংবা ডেজার্ট।
কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, আকাশে উড়তে থাকা একটি উড়োজাহাজে এই খাবার কীভাবে তৈরি হয়? উড়োজাহাজের ভেতরেই কি রান্না করা হয়, নাকি মাটি থেকেই খাবার তৈরি করে নিয়ে আসা হয়? খাবারগুলো কতক্ষণ ভালো থাকে? কীভাবে গরম করা হয়? আর শত শত যাত্রীর কাছে একই সময়ে খাবার পৌঁছে দেন কীভাবে?
আসলে উড়োজাহাজে খাবার তৈরির প্রক্রিয়া বেশ পরিকল্পিত।একটি খাবার যাত্রীর সামনে পৌঁছানোর আগে পেরিয়ে আসে বেশ কয়েকটি ধাপ। এর সঙ্গে যুক্ত থাকেন শেফ, খাদ্যপ্রযুক্তিবিদ, মান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা, পরিবহনকর্মী এবং কেবিন ক্রুরা।
উড়োজাহাজের খাবারের এই পুরো ব্যবস্থাকে বলা হয় ইনফ্লাইট ক্যাটারিং বা এয়ারলাইন ক্যাটারিং।
উড়োজাহাজের খাবার তৈরি হয় কোথায়?
বিশ্বের বড় বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশে রয়েছে বিশেষায়িত খাবার তৈরির রান্নাঘর। এগুলোকে বলা হয় ফ্লাইট ক্যাটারিং কিচেন বা ফ্লাইট কিচেন।
সাধারণ রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের সঙ্গে এর পার্থক্য অনেক। এখানে প্রতিদিন বিভিন্ন উড়োজাহাজ সংস্থার জন্য হাজার হাজার যাত্রীর খাবার তৈরি করা হয়। খাবারের পরিমাণ, যাত্রাপথ, ফ্লাইটের সময়, যাত্রীসংখ্যা এবং তাদের খাদ্যাভ্যাস বিবেচনায় রেখে তৈরি হয় প্রতিদিনের মেনু।
দুবাইয়ের এমিরেটস ফ্লাইট ক্যাটারিং বিশ্বের পরিচিত বড় এয়ারলাইন্স ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এ ছাড়া ডানাটা বিভিন্ন বিমান সংস্থাকে ক্যাটারিং সেবা দিয়ে থাকে।
এসব প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘরে খাবারের ধরন অনুযায়ী আলাদা বিভাগ থাকে। কোথাও মাংস ও মাছ রান্না হয়, কোথাও তৈরি হয় ভাত, পাস্তা ও সবজি। আবার আলাদা বিভাগে তৈরি করা হয় সালাদ, রুটি, ফল ও ডেজার্ট।
খাবারের তালিকাও তৈরি করা হয় বেশ চিন্তাভাবনা করে। কারণ, উড়োজাহাজে পরিবেশিত সব খাবার যাত্রীরা সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলেন না। কিছু খাবার রান্নার পর ঠান্ডা করে রাখতে হয়, পরে উড়োজাহাজের ওভেনে গরম করে পরিবেশন করতে হয়। তাই রান্নার পর খাবারের স্বাদ, গঠন ও মান কেমন থাকবে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
রান্নার পর খাবার ঠান্ডা করা হয় কেন?
উড়োজাহাজের অধিকাংশ গরম খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত হয় কুক-চিল প্রসেস। সহজভাবে বললে, এ পদ্ধতিতে খাবার আগে রান্না করা হয়, এরপর দ্রুত ঠান্ডা করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়। পরিবেশনের আগে আবার গরম করা হয়।
এই পদ্ধতি ব্যবহারের মূল কারণ খাদ্যনিরাপত্তা। রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফেলে রাখলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ঝুঁকি থাকে। তাই রান্নার পর দ্রুত ঠান্ডা করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সংরক্ষণ করা জরুরি।
প্রথমে প্রয়োজনীয় উপকরণ পরিষ্কার ও প্রস্তুত করা হয়। এরপর খাবার রান্না করা হয়। রান্না শেষ হলে খাবার দ্রুত ঠান্ডা করার জন্য বিশেষ যন্ত্রে নেওয়া হয়। পরে নির্দিষ্ট পরিমাণে ভাগ করে খাবারের পাত্রে সাজানো হয়। সবশেষে সংরক্ষণের জন্য রাখা হয় কোল্ড রুম বা ডিপ ফ্রিজে।
তবে সব খাবার এই পদ্ধতিতে তৈরি হয় না। সালাদ, ফল, স্যান্ডউইচ ও বিভিন্ন ডেজার্টের মতো খাবার ঠান্ডা অবস্থায়ই পরিবেশন করা হতে পারে।
কত ডিগ্রি তাপমাত্রায় ঠান্ডা রাখা হয় উড়োজাহাজের খাবার?
উড়োজাহাজের খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, খাবার রান্না হওয়ার পর থেকে যাত্রীর সামনে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়।
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) গাইডেন্স ম্যাটেরিয়াল অন মেইনটেনিং অ্যা স্ট্যান্ডার্ড ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টার বা একটি মানসম্মত ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টার পরিচালনার বিষয়ে নির্দেশনামূলক উপাদান নির্দেশিকায় খাবার সংরক্ষণের জন্য কয়েকটি তাপমাত্রার কথা বলা হয়েছে।
রেফ্রিজারেটর ও কোল্ড রুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা, ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ফ্রোজেন খাবারের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ব্লাস্ট ফ্রিজারের ঠান্ডা বাতাসের তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, উড়োজাহাজে ঠান্ডা খাবারের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং উড়োজাহাজে গরম খাবারের তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ব্লাস্ট ফ্রিজারের বাতাসের তাপমাত্রা মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে খাবারের ভেতরের তাপমাত্রাও সঙ্গে সঙ্গে মাইনাস ৩৫ ডিগ্রিতে নেমে যায়।
রান্না করা খাবার দ্রুত ঠান্ডা করতে ব্যবহৃত হয় ব্লাস্ট চিলার। আর খাবার জমিয়ে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয় ব্লাস্ট ফ্রিজার।
ব্লাস্ট চিলার কীভাবে কাজ করে?
ব্লাস্ট চিলার সাধারণ ফ্রিজের মতো নয়। এতে শক্তিশালী ঠান্ডা বাতাস দ্রুত খাবারের চারপাশে প্রবাহিত হয়। ফলে খাবারের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার তুলনায় অনেক দ্রুত কমে আসে।
অন্যদিকে, ব্লাস্ট ফ্রিজার খাবারকে আরও কম তাপমাত্রায় নিয়ে গিয়ে জমিয়ে সংরক্ষণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)-এর ২০২২ সালের খাদ্য বিধি অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় রাখার প্রয়োজন এমন রান্না করা খাবারকে প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যে ৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস-এ নামাতে হবে। এরপর রান্না শেষ হওয়ার মোট ছয় ঘণ্টার মধ্যে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে আনতে হবে।
এটি খাদ্যনিরাপত্তার একটি স্বীকৃত নির্দেশনা। বিভিন্ন ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কার্যপদ্ধতি ও স্থানীয় বিধি অনুযায়ী প্রক্রিয়ায় কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
রান্নাঘর থেকে উড়োজাহাজে খাবার পৌঁছায় কীভাবে?
খাবার রান্না ও প্যাকেজিং শেষ হলে শুরু হয় পরিবহনের পালা। এ কাজে ব্যবহার করা হয় বিশেষ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের উপযোগী গাড়ি।
রান্নাঘর থেকে খাবার উড়োজাহাজে পৌঁছানোর সময় ঠান্ডা খাবারের নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখা জরুরি। এ জন্য রেফ্রিজারেটেড পরিবহনের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
উড়োজাহাজে খাবার ওঠানোর জন্য বিশেষ ধরনের গাড়ি ব্যবহার করা হয়, যার নাম ক্যাটারিং হাই লোডার। গাড়িটি দেখতে অনেকটা বড় লিফটযুক্ত ট্রাকের মতো। এর ওপরের অংশ হাইড্রোলিক ব্যবস্থায় ওপরে ওঠানো যায়। ফলে উড়োজাহাজের দরজার উচ্চতার সঙ্গে মিলিয়ে খাবারের ট্রলি ও অন্যান্য সরঞ্জাম সহজেই ভেতরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
এই পর্যায়ে সময়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ফ্লাইট ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম উড়োজাহাজে পৌঁছে দিতে হয়।
উড়োজাহাজের ভেতরে কোন ওভেনে খাবার গরম করা হয়?
উড়োজাহাজের ভেতরে খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের জন্য আলাদা একটি জায়গা থাকে। একে বলা হয় এয়ারক্রাফট গ্যালি বা উড়োজাহাজের রান্নাঘর। এটি মূলত উড়োজাহাজের রান্নাঘর বা খাবার পরিবেশনের প্রস্তুতকেন্দ্র। এখানে থাকে বিশেষ ওভেন, খাবারের ট্রলি, পানীয় তৈরির সরঞ্জাম, গরম পানির ব্যবস্থা এবং খাবার রাখার জায়গা।
উড়োজাহাজের ওভেন সাধারণ বাড়ির ওভেনের মতো নয়। উড়োজাহাজের বিদ্যুৎব্যবস্থা, জায়গা ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে এগুলো তৈরি করা হয়।
বিভিন্ন উড়োজাহাজে সাধারণত কয়েক ধরনের ওভেন দেখা যায়।
১. কনভেকশন ওভেন
উড়োজাহাজের খাবার গরম করার ক্ষেত্রে এটি বহুল ব্যবহৃত ওভেনগুলোর একটি। এতে বৈদ্যুতিক হিটিং এলিমেন্ট তাপ তৈরি করে এবং ফ্যানের মাধ্যমে গরম বাতাস ওভেনের ভেতরে ঘোরানো হয়। ফলে খাবার তুলনামূলকভাবে সমানভাবে গরম হয়।
২. স্টিম ওভেন
এ ধরনের ওভেনে বাষ্পের সাহায্যে খাবার গরম করা হয়। কিছু খাবারের আর্দ্রতা ও নরমভাব ধরে রাখতে এটি কাজে আসে।
৩. কম্বিনেশন স্টিম ওভেন
এতে গরম বাতাস ও বাষ্প- দুটিই ব্যবহার করা যায়। ফলে খাবারের ধরন অনুযায়ী গরম করার পদ্ধতি বেছে নেওয়া সম্ভব।
৪. মাইক্রোওয়েভ ওভেন
কিছু উড়োজাহাজে মাইক্রোওয়েভ ওভেনও থাকে। নির্দিষ্ট খাবার ও পানীয় দ্রুত গরম করার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়। তবে সব উড়োজাহাজে একই ধরনের ওভেন থাকে না। উড়োজাহাজের মডেল, গ্যালির নকশা ও এয়ারলাইনের প্রয়োজন অনুযায়ী সরঞ্জামের ধরন আলাদা হয়।
অর্থাৎ, উড়োজাহাজের গ্যালিতে থাকা ওভেনগুলো শুধু খাবার গরম করার যন্ত্র নয়; এগুলো সীমিত জায়গায় নিরাপদে ও নির্দিষ্ট সময়ে খাবার প্রস্তুত করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি।
কত ডিগ্রি তাপমাত্রায় উড়োজাহাজের ওভেনে খাবার গরম করা হয়?
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা দরকার। একটি হলো ওভেনের ভেতরের তাপমাত্রা, অন্যটি হলো খাবারের ভেতরের তাপমাত্রা। দুটিকে এক মনে করলে ভুল হবে।
উদাহরণ হিসেবে এরোলাক্স-এর এএল-ওইউ৫০-২০০০ সিরিজের ওভেনে ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও ২৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সেটিং উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ওভেন ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস-এ চালানো হচ্ছে মানেই খাবারের ভেতরেও ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পৌঁছেছে, এমন নয়।
ওভেনের গরম বাতাস খাবারের বাইরের অংশকে গরম করে। এরপর তাপ ধীরে ধীরে খাবারের ভেতরের অংশে পৌঁছায়।
তাই খাবার কতক্ষণ গরম করতে হবে, তা নির্ভর করে খাবারের ধরন, পরিমাণ, পাত্র এবং ওভেনের ক্ষমতার ওপর।
নিরাপদভাবে পুনরায় গরম করার ক্ষেত্রে খাবারের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রা বা অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ খাদ্যনিরাপত্তা নির্দেশনায় পুনরায় গরম করা খাবারের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রা অন্তত ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর মান ব্যবহার করা হয়। তবে এয়ারলাইন ও ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অনুমোদিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
খাবার গরম করতে কত সময় লাগে?
সব খাবারের জন্য একই সময় প্রয়োজন হয় না। উদাহরণ হিসেবে, কলিন্স অ্যারোস্পেস-এর এন্ডুরা কনভেকশন ওভেনের প্রস্তুতকারক-প্রকাশিত তথ্যে কিছু খাবার প্রায় ২২ মিনিটে প্রস্তুত করার কথা বলা হয়েছে। আবার অ্যারোলাক্সের নির্দিষ্ট ওভেন মডেলে খাবার গরম করতে প্রায় ২৫-৩০ মিনিটের সময় উল্লেখ করা হয়েছে।
এগুলো নির্দিষ্ট যন্ত্রের উদাহরণ; সব উড়োজাহাজে বা সব খাবারের ক্ষেত্রে একই সময় প্রযোজ্য নয়।
উড়োজাহাজে খাবার কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়?
উড়োজাহাজের গ্যালিতে খাবার রাখার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ও সরঞ্জাম থাকে। ঠান্ডা খাবার রাখা হয় রেফ্রিজারেটেড মডিউল বা উপযুক্ত ঠান্ডা কনটেইনারে। কিছু ক্ষেত্রে ড্রাই আইস ব্যবহার করা হয়।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, উড়োজাহাজে ঠান্ডা খাবার ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং গরম খাবার ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে রাখার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
ফ্লাইটের ধরন ও খাবারের প্রকৃতি অনুযায়ী সংরক্ষণের ব্যবস্থা বদলে যায়। স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইটে খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের সময়ের ব্যবধান কম হতে পারে। দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইটে খাবার ঠান্ডা বা ফ্রোজেন অবস্থায় উড়োজাহাজে নিয়ে গিয়ে পরে গরম করা হতে পারে।
উড়োজাহাজের খাবার পরিবেশন করেন কারা?
খাবার প্রস্তুত করেন ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। আর যাত্রীদের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন কেবিন ক্রুরা।
ফ্লাইট ছাড়ার আগে তারা খাবার ও পানীয়ের পরিমাণ পরীক্ষা করেন। বিশেষ খাবারের অর্ডার ঠিক আছে কি না, সেটিও মিলিয়ে নেন।
উড়োজাহাজ নিরাপদ উচ্চতায় পৌঁছানোর পর খাবার পরিবেশনের প্রস্তুতি শুরু হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ওভেনে খাবার গরম করা হয়। এরপর ট্রেতে সাজিয়ে যাত্রীদের সামনে পরিবেশন করা হয়।
ইকোনমি ক্লাসে সাধারণত একসঙ্গে সাজানো ট্রেতে খাবার দেওয়া হয়। বিজনেস ও ফার্স্ট ক্লাসে খাবার আলাদা পাত্রে সাজিয়ে একাধিক ধাপে পরিবেশন করা হতে পারে।
একটি বড় উড়োজাহাজে কয়েকশ যাত্রী থাকলে এই কাজ সম্পন্ন করতে বেশ সময় লাগে। কারণ, খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি কেবিন ক্রুদের পানীয় দেওয়া, যাত্রীদের প্রয়োজন মেটানো এবং ব্যবহৃত ট্রে সংগ্রহের কাজও করতে হয়।
উড়োজাহাজের খাবারের স্বাদ মাটির তুলনায় আলাদা লাগে কেন?
অনেক যাত্রীই বলেন, উড়োজাহাজে খাবার খেলে মাটির তুলনায় স্বাদ কিছুটা আলাদা লাগে। এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণ।
উড়োজাহাজের কেবিনে বায়ুচাপ ও আর্দ্রতা মাটির পরিবেশের মতো থাকে না। বিশেষ করে দীর্ঘ ফ্লাইটে কেবিনের আর্দ্রতা অনেক কমে যেতে পারে। শুষ্ক পরিবেশে ঘ্রাণশক্তি কিছুটা কম কার্যকর হয়। ফলে খাবারের স্বাদ অনুভবেও পরিবর্তন আসে।
২০১৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ গ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড ফুড সায়েন্সে প্রকাশিত ‘টেস্টিং ইন দ্যা এয়ার: এ রিভিউ’ গবেষণায় উড়োজাহাজের পরিবেশে স্বাদ ও ঘ্রাণ অনুভূতির পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এছাড়া উড়োজাহাজের ভেতরের একটানা শব্দও খাবারের স্বাদ অনুভবের অভিজ্ঞতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে উড়োজাহাজের খাবারের মেনু তৈরির সময় শুধু মাটিতে স্বাদ পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। খাবারটি গরম করার পর কেবিনের পরিবেশে কেমন লাগবে, সেটিও বিবেচনা করা হয়।
সব যাত্রীর জন্য কি একই খাবার থাকে?
না। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে যাত্রীদের খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনায় বিভিন্ন ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রাখা হয়।
যেমন-
- হালাল খাবার: ইসলামি খাদ্যবিধি অনুযায়ী প্রস্তুত খাবার।
- ভেজিটেরিয়ান খাবার: মাংস ও মাছ ছাড়া খাবার।
- ভেগান খাবার: প্রাণিজ উপাদানবিহীন খাবার।
- গ্লুটেন-ফ্রি খাবার: গ্লুটেন এড়িয়ে চলেন এমন যাত্রীদের জন্য।
- শিশুদের খাবার: বয়স অনুযায়ী উপযোগী খাবার।
- কম লবণযুক্ত খাবার: বিশেষ খাদ্যচাহিদার জন্য।
এসব খাবার সাধারণ খাবার থেকে আলাদা করে প্রস্তুত ও চিহ্নিত করা হয়। বিশেষ খাবার প্রয়োজন হলে ফ্লাইটের আগে সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজ সংস্থাকে জানানো ভালো। কারণ, সব এয়ারলাইন সব ধরনের বিশেষ খাবার সরবরাহ করে না।
খাবার বেঁচে গেলে কী করা হয়?
প্রতিটি ফ্লাইটে কতজন যাত্রী খাবার নেবেন, তা আগে থেকেই অনুমান করা হয়। কিন্তু সব সময় হিসাব মেলে না। কেউ খাবার নেন না, কেউ আবার নিজের পছন্দ অনুযায়ী অন্য খাবার বেছে নেন। ফলে কিছু খাবার অব্যবহৃত থেকে যায়।
এ ধরনের খাবারের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজ সংস্থার খাদ্যনিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম অনুসরণ করা হয়। পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত খাবার শুধু বেঁচে গেছে বলেই পরবর্তী ফ্লাইটে ব্যবহার করা যায় না। খাবারের ধরন, সংরক্ষণের সময় ও তাপমাত্রা বিবেচনায় নিয়ে তা ব্যবস্থাপনা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অবশিষ্ট খাবার ফেলে দিতে হয়।
খাবারের অপচয় কমাতে বিভিন্ন উড়োজাহাজ সংস্থা এখন যাত্রীদের আগাম খাবার নির্বাচন এবং যাত্রীসংখ্যা অনুযায়ী খাবার প্রস্তুতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
মাটির রান্নাঘর থেকে আকাশের খাবারের ট্রে
উড়োজাহাজে বসে আমরা যখন খাবার খাই, তখন হয়তো মনে হয় এটি একটি সাধারণ সেবা। কিন্তু সেই খাবার যাত্রীর সামনে পৌঁছানোর আগে বেশ কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে আসে।
প্রথমে বিশেষায়িত রান্নাঘরে খাবার প্রস্তুত হয়। এরপর দ্রুত ঠান্ডা করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়। বিশেষ গাড়িতে করে বিমানবন্দরে পৌঁছানো হয়। সেখান থেকে ক্যাটারিং হাই লোডারের মাধ্যমে বিমানে ওঠানো হয়। পরে বিমানের এয়ারক্রাফ্ট গ্যালিতে থাকা কনভেকশন ওভেন কিংবা অন্য উপযুক্ত ওভেনে খাবার গরম করা হয়। সবশেষে কেবিন ক্রুরা তা যাত্রীদের সামনে পরিবেশন করেন।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় খাবারের স্বাদ ও মানের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় নিরাপত্তা, সময় এবং সঠিক তাপমাত্রাকে।
তাই পরেরবার বিমানে খাবারের ট্রে সামনে এলে মনে রাখতে পারেন, আপনার কয়েক মিনিটের খাবারের পেছনে রয়েছে অনেক মানুষের পরিকল্পনা, শ্রম এবং বিশেষায়িত প্রযুক্তির ব্যবহার।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক