কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েও কি শুল্ক বসাতে পারবেন ট্রাম্প?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রেসিডেন্টের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটে বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হলে আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনের ওপর নজরদারিতে প্রেসিডেন্টকে বাড়তি বাধার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলেই আর কোনো দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করতে পারবেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনে প্রেসিডেন্টকে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের নতুন অনুমোদন ছাড়াই শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ট্রাম্পের হাতে বিকল্প আইনি পথ থাকবে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ক্ষমতা কতটা বিস্তৃত এবং কোথায় গিয়ে তার ক্ষমতার সীমা তৈরি হবে?
কোন আইনে শুল্ক আরোপ করতে পারবেন ট্রাম্প?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১, ধারা ৮ অনুযায়ী, বিদেশি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সাংবিধানিক ক্ষমতা মূলত কংগ্রেসের হাতে। তবে কংগ্রেস বিভিন্ন সময়ে আইন করে প্রেসিডেন্টকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের (সিআরএস) ১৯ মার্চ ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের হাতে শুল্ক আরোপের জন্য একাধিক আইনি পথ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি হলো-
১. সেকশন ২৩২ : জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে শুল্ক
১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইন-এর সেকশন ২৩২ অনুযায়ী, কোনো পণ্যের আমদানি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে বলে বাণিজ্য বিভাগ তদন্তে প্রমাণ পেলে প্রেসিডেন্ট সেই পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে শুল্ক আরোপ করতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিভাগের তদন্ত ও সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রেসিডেন্টকে বিভাগের সুপারিশ হুবহু অনুসরণ করতে হয় না। এই আইনে শুল্কের পরিমাণ বা মেয়াদের নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমাও উল্লেখ নেই। ট্রাম্প এর আগে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি ও বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপে এই আইনের আশ্রয় নিয়েছেন।
২. সেকশন ৩০১ : অন্য দেশের বাণিজ্যিক অনিয়মের জবাব
১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১ অনুযায়ী, কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি লঙ্ঘন করলে কিংবা অন্যায্য ও বৈষম্যমূলক বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) তদন্ত করে। তদন্তে অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি হয়।
চীনের বিভিন্ন পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে কংগ্রেসে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলেও এই আইনের অধীনে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নতুন শুল্ক আরোপের সুযোগ থাকবে।
৩. সেকশন ১২২ : আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা
১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ১২২ প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলায় সাময়িক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয়।
এই ধারায় সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা যায় এবং তা সর্বোচ্চ ১৫০ দিন কার্যকর থাকতে পারে। এর বেশি সময় কার্যকর রাখতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ, এই ধারার ক্ষমতা ব্যবহার করেও ট্রাম্প সাময়িকভাবে শুল্ক আরোপ করতে পারবেন। তবে তা অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে কীভাবে বাধার মুখে পড়বেন ট্রাম্প?
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের একক নিয়ন্ত্রণ থাকছে না।
এর ফলে ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হতে পারে।
নতুন আইন প্রণয়ন: ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করতে নতুন আইন প্রস্তাব করতে পারবে।
তদন্ত ও নজরদারি: শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত, বাণিজ্য বিভাগের তদন্ত এবং প্রশাসনের ব্যয়ের বিষয়ে কংগ্রেস তদন্ত করতে পারবে।
শুল্কনীতি পরিবর্তনের উদ্যোগ: প্রেসিডেন্টকে দেওয়া বিদ্যমান আইনি ক্ষমতা সংশোধন বা বাতিলের উদ্যোগ নিতে পারবে।
বাজেট ও অর্থায়ন: প্রশাসনের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কর্মসূচির অর্থায়ন নিয়ে বিরোধ তৈরি করতে পারবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও প্রেসিডেন্টের সম্মতি ছাড়া কোনো বিল সহজেই আইনে পরিণত করতে পারবে না। ট্রাম্প কোনো বিলে ভেটো দিলে সেটি অতিক্রম করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে। ফলে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েই প্রেসিডেন্টের বিদ্যমান শুল্ক আরোপের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
ট্রাম্পের সামনে কী বিকল্প থাকছে?
সবকিছু বিবেচনায় ট্রাম্পের সামনে এখনো কয়েকটি আইনি বিকল্প রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সেকশন ২৩২, অন্য দেশের বাণিজ্যিক অনিয়মের ক্ষেত্রে সেকশন ৩০১ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলায় সেকশন ১২২ ব্যবহার করতে পারবেন।
তবে প্রতিটি আইনের নিজস্ব শর্ত রয়েছে। কোথাও তদন্ত প্রয়োজন, কোথাও নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে, আবার কোথাও শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এসব আইনের আওতায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগ নিতে পারে। বিশেষ করে শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তদন্ত, কংগ্রেসকে অবহিত করা এবং অনুমোদনের শর্ত আরও কঠোর করার চেষ্টা করতে পারে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক