প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়লেন এল-সায়েদ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি হয়েছে। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেনেট আসনের লড়াইয়ে জয়লাভ করেছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা ড. আব্দুল এল-সায়েদ। তিনি সাবেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা মাইক রজার্সকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চকক্ষ সেনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে ডেট্রয়েটে নিজের নির্বাচনি প্রধান কার্যালয়ে বিপুল সমর্থকের উপস্থিতিতে বিজয় ভাষণ দেন এল-সায়েদ। সেখানে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তিনি বলেন, মিশিগান, আমরা করে দেখিয়েছি! এই মহান অঙ্গরাজ্যের বিজয়ী সিনেটর হিসেবে আপনাদের সামনে দাঁড়াতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত এবং সম্মানিত বোধ করছি।
অবসর গ্রহণকারী ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর গ্যারি পিটার্সের শূন্য আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৪২ বছর বয়সী আব্দুল এল-সায়েদ। পেশায় একজন চিকিৎসক হওয়ায় মার্কিন সিনেটের ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের পর তিনিই নির্বাচিত প্রথম ডেমোক্র্যাটিক ডাক্তার সিনেটর হতে যাচ্ছেন।
এনবিসি নিউজের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, মোট ৪৩ লাখ ৪০ হাজার ৪৭৮টি প্রাপ্ত ভোটের মধ্যে আব্দুল এল-সায়েদ ২২ লাখ ৫১ হাজার ৮৫০টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন, যা মোট ভোটের ৫১.৯ শতাংশ। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মাইক রজার্স পেয়েছেন ২০ লাখ ২ হাজার ২৮৫টি ভোট (৪৬.১ শতাংশ)। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী লিডিয়া ক্রিস্টেনসেন ৪৪ হাজার ৮৯৩টি ভোট পেয়েছেন, যা মোট ভোটের ১.০ শতাংশ। এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, এই আসনে ৮৭.৪ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। আনুমানিক ৬ লাখ ২৫ হাজার ভোট গণনা বাকি থাকা অবস্থাতেই এল-সায়েদের জয় নিশ্চিত হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে পথটা মোটেও সহজ ছিল না। নির্বাচনের ঠিক শেষ মুহূর্তে নিজের দলের ভেতরেই এক বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। ডেমোক্র্যাটিক প্রাথমিক বাছাই বা প্রাইমারি নির্বাচনে এল-সায়েদের কাছে হেরে যাওয়া কংগ্রেসউইম্যান হ্যালি স্টিভেন্স শেষ সময়ে এসে নাটকীয়ভাবে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। তবে দলের ভেতরে এমন বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রগতিশীল সাধারণ ভোটারদের সমর্থন পুরোপুরি নিজের দিকে টেনে নিতে পেরেছেন এল-সায়েদ। সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের মতো বর্ষীয়ান প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট নেতাদের জোরালো সমর্থনও তার এই জয়কে বেগবান করেছে।
অন্যদিকে, পুরো নির্বাচনি প্রচারণাজুড়ে প্রতিপক্ষ রিপাবলিকান শিবির এল-সায়েদের বিরুদ্ধে চরম আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়। তারা ডেমোক্র্যাটদের কমিউনিস্ট বলে আখ্যা দিতে থাকে। তারা এল-সায়েদকে উগ্র ও ক্ষতিকারক হিসেবে চিত্রিত করে সাধারণ ভোটারদের ভয় দেখানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু কোনো নেতিবাচক প্রচারণা বা কট্টর আক্রমণ তাকে দমাতে পারেনি।
সহজ ও স্পষ্টভাষী হিসেবে পরিচিত এই চিকিৎসক ভোটারদের মূল অর্থনৈতিক কষ্টের জায়গাগুলোতে নজর দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অতি-ব্যয়বহুল চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারই ছিল তার প্রচারণার প্রধান হাতিয়ার। ভোটের আগের দিন তিনি মিশিগানের সাধারণ মানুষদের আশ্বাস দিয়ে বলেন, একটি চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্টের পর যেন আপনাদের কাছে পাহাড়সম বিল না আসে, সেই অধিকার আপনাদের নিশ্চিত হওয়া উচিত।
তিনি মার্কিন চিকিৎসা ব্যবস্থায় শত শত কোটি ডলারের বাণিজ্যিক মুনাফাকেন্দ্রীক কাঠামোকে পুরোপুরি বদলে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বা ইউনিভার্সাল হেলথকেয়ারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি মিশিগানের রিপাবলিকান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রক্ষণশীল এলাকাগুলোতেও বিশাল জনসভা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি মার্কিন রাজনীতি থেকে করপোরেট অর্থের প্রভাব সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং আর্থিক মন্দায় জর্জরিত ভোটারদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার প্রগতিশীল বার্তা নিয়ে লড়াই করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ১৭৮৯ সালে মার্কিন সিনেট প্রতিষ্ঠার পর ২৩৭ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মুসলিম প্রতিনিধি মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষে স্থান করে নিয়ে ইতিহাস গড়েছেন। এর আগে প্রতিনিধি পরিষদে একাধিক মুসলিম প্রতিনিধি নির্বাচিত হলেও গত দুই শতাব্দীর বেশি সময়ে সিনেটে কোনো মুসলিম প্রতিনিধি জয়লাভ করতে পারেননি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক