রাশিয়ার নির্বাচনে কোনো দলই যুদ্ধবিরোধী মনোভাব দেখাতে পারছে না
এই সপ্তাহে রাশিয়া জুড়ে সাধারণ মানুষ তাদের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটিতে আয়োজিত এটিই প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন।
তাত্ত্বিকভাবে রাশিয়ার পার্লামেন্ট দুমার ৪৫০টি আসন এই নির্বাচনে উন্মুক্ত থাকলেও, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ‘ইউনাইটেড রাশিয়া’ পার্টি তাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। খবর আলজাজিরার।
এই নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে একজন হলেন দামির গুরিন, যিনি রাশিয়ার সুদূর পূর্ব ফেডেরাল জেলা থেকে গ্রিন পার্টির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই অঞ্চলটি সাইবেরিয়ার জঙ্গল ও প্রশান্ত মহাসাগরের মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত। তার নির্বাচনি অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন, শিল্পবর্জ্যের নির্গমন পর্যবেক্ষণ এবং ল্যান্ডফিলের বদলে রিসাইক্লিং বা বর্জ্য পুনর্নবীকরণকে উৎসাহিত করা।
দামির গুরিন বলেন, ‘আমার লক্ষ্য হলো এই প্রতিকূল অঞ্চল ও এখানকার মানুষকে উপযুক্ত পরিবেশগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব প্রদান করা। আমরা কেবল প্রকৃতির সমস্যা সমাধান করছি না, আমরা মানুষের জীবনযাত্রার পরিবেশও রক্ষা করছি।’
রাশিয়ায় পরিবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হলেও, অন্যান্য রাজনৈতিক সংকট এটিকে আড়াল করে দিতে পারে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নির্বাচন প্রচারণার একটি বিজ্ঞাপনে ইতিহাসখ্যাত রুশ বীরদের প্রদর্শনী শেষে বার্তা দেওয়া হচ্ছে: “তাদের কণ্ঠস্বরই বিজয়ের সুর। আপনার ভোটই রাশিয়ার মূল শক্তি!”
ইউক্রেন আক্রমণের অফিশিয়াল পরিভাষা ব্যবহার করে পুতিন গত বুধবার এক সাধারণ ভাষণে বলেন, ‘আমাদের বিশেষ সামরিক অভিযান চলমান থাকা অবস্থাতেই এই বিস্তৃত নির্বাচনি প্রচারণা পরিচালিত হচ্ছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আপনার পছন্দ ও দৃঢ় সংকল্প পুনরায় প্রমাণ করবে যে লাখ লাখ মানুষ আমাদের যোদ্ধাদের সমর্থন দিচ্ছে এবং আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছি।’
ইউনাইটেড রাশিয়ার শীর্ষ প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন কঠোরপন্থী মনোভাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এবং মারিউপোল অবরুদ্ধকরণের অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত যুদ্ধাহত সেনা ভ্লাদিস্লাভ গোলোভিন।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক রুশ সমাজবিজ্ঞানী ইলিয়া বুদ্রাইৎস্কিস জানান, ক্রেমলিন মূলতঃ ইউক্রেন যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের কাছ থেকে সরাসরি একটি সমর্থনের রায় বা গণরায় খুঁজছে। বুদ্রাইৎস্কিস আল জাজিরাকে বলেন, ‘পুতিন ক্রমাগতভাবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অবৈধ হিসেবে বর্ণনা করেন, কারণ তিনি যুদ্ধকালীন নির্বাচন পরিচালনা করছেন না।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘রাশিয়ায়, পুতিন জোর দিয়ে যেমনটা বলেছেন, ঠিক সময়সূচী অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়া মেনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ তাদের এই বৈধতা বজায় রাখছে।’
এমন এক সময়ে এই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন যুদ্ধের প্রভাব দেশের সাধারণ জীবনযাত্রায় ক্রমেই বেশি করে অনুভূত হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে নির্বাচন শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ইউক্রেন মস্কোর দিকে ৩৫০টিরও বেশি ড্রোন দিয়ে হামলা চালায়।
‘পাম্পে জ্বালানি এলেই মানুষ সাথে সাথে দীর্ঘ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে যায়,’ বলেন সেন্ট পিটার্সবার্গের মধ্যত্রিশের বাসিন্দা আলেক্সি, যিনি তাঁর পুরো নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনি এই নির্বাচনকে একটি ‘প্রহসন’ বলে মনে করেন।
নির্বাচন থেকে যুদ্ধবিরোধী দলকে বাদ দেওয়া
রাশিয়ার সমস্ত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কেবল লিবারেল 'ইয়াবলুকো' পার্টিই প্রকাশ্য যুদ্ধের বিরোধিতা করে এবং অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির দাবি জানায়।
কিন্তু আগস্টে 'রোদিনা' নামক একটি ক্ষুদ্র জাতীয়তাবাদী দলের অভিযোগের ভিত্তিতে একজন বিচারক ইয়াবলুকো পার্টিকে নির্বাচন থেকে বাদ দেন। অভিযোগগুলো ছিল কপিরাইট লঙ্ঘন, উগ্রবাদ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন।
এ বিষয়ে বুদ্রাইৎস্কিস বলেন, ‘অবশ্যই এমনটি ঘটেছে কারণ জরিপ অনুযায়ী ইয়াবলুকো দুমায় প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন ৫ শতাংশের বাধা পার করে ফেলত। ইয়াবলুকো অবিলম্বে শান্তিপূর্ণ আলোচনা, সমস্ত যুদ্ধকালীন বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, দমন-পীড়ন বন্ধ ইত্যাদি স্লোগান তুলে তাদের নির্বাচনি প্রচারণা পরিচালনা করত। আর এ ধরনের একটি গণপ্রচারণার অনুমতি দেওয়া সরকারের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতো, কারণ এটি জনগণের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ছিল।’
তবে মস্কোভিত্তিক মিডিয়া পেশাদার এবং পুতিন সরকারের সমর্থক সের্গেই কালেনিকের মতে, ইয়াবলুকোকে বাদ দেওয়ার অর্থ হলো রাশিয়ান গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘পূর্বে নির্বাচনগুলো ছিল জীবন-মৃত্যুর আসল লড়াই, কারণ দেশপ্রেমিকদের এগোনোর যেকোনো প্রচেষ্টাকে আটকে দেওয়া হতো।’
সের্গেই কালেনিক ইয়াবলুকোর সহ-প্রতিষ্ঠাতা গ্রিগরি ইয়াভলিন্সকিকে একজন উগ্র ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদী হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন তোলেন ‘পার্লামেন্টে এমন একটি দলের অস্তিত্ব থাকলে সেখানে আবার কীসের গণতন্ত্র?’
তা সত্ত্বেও, তাদের অধিকাংশ প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও, ইয়াবলুকোর ব্যক্তিগত সদস্যরা পার্টি-তালিকার ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বদলে একক-আসন বিশিষ্ট কেন্দ্রগুলোতে প্রার্থী হিসেবে লড়াই করার সুযোগ পাচ্ছে। মস্কোতে ইয়াবলুকোর পলিনা লেরমান্ট মস্কোবাসীদের শান্তির পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে লিফলেট বিতরণ করেছেন।
গ্রিন পার্টির প্রার্থী দামির গুরিন স্বীকার করেছেন যে, মামলা এবং অভিযোগগুলো রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে, তবে তিনি যোগ করেন, অন্যান্য দলের ডজন ডজন প্রার্থীকেও অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে—যার মধ্যে সাধারণত ক্রেমলিনপন্থি হিসেবে পরিচিত কমিউনিস্ট পার্টির সারাতোভ প্রতিনিধি নিকোলাই বোন্দারেঙ্কোও রয়েছেন। গুরিন বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিবেশ হলো কঠোর শৃঙ্খলা এবং প্রতিযোগিতার একটি ময়দান।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক