ট্রাম্প-পুতিন চুক্তির পরও রাশিয়ার ডিজেল কিনতে ব্যবসায়ীদের অনীহা কেন?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে অর্জিত চুক্তির প্রায় এক মাস অতিবাহিত হলেও এখনো যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছায়নি কোনো রুশ ডিজেল। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলবাহী অন্তত তিনটি রুশ ট্যাঙ্কার তাদের গন্তব্য বদলে ফেলায় এই চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন বাজারে ডিজেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মার্কিন ও বৈশ্বিক বাজারে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে অক্টোবরে সম্মত হয়েছিলেন ট্রাম্প ও পুতিন। তবে চুক্তির পর রাশিয়া মোট চারটি ডিজেলবাহী ট্যাঙ্কার পাঠালেও একটিও মার্কিন উপকূলে পৌঁছাতে পারেনি।
ট্রাম্প ও পুতিনের চুক্তির মূল বিষয়বস্তু
গত ৯ অক্টোবর পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম এই চুক্তির কথা জানান। ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্ট অনুযায়ী- রাশিয়া অবিলম্বে মার্কিন ও বিশ্ববাজারের জন্য তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং এর পরপরই আরও ১০ লাখ টন ডিজেল পাঠানো হবে।
ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রুশ ডিজেল বিক্রি, খালাস ও আমদানি করার সুযোগ রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রুশ জ্বালানি আমদানিতে যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ওফাক সাময়িক ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে সেই নীতির ব্যতিক্রম ঘটায়। তবে এই চুক্তির বিষয়ে লিখিত কোনো নথিপত্র আছে কি না বা কোন মূল্যে বা কোন শর্তে এই চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা হোয়াইট হাউস বা ক্রেমলিন প্রকাশ করেনি।
জ্বালানি সংকট নিরসনে এই ডিজেলের ভূমিকা কেমন?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিতে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে কম জ্বালানি পাঠাচ্ছে রাশিয়া। রাশিয়া থেকে পাঠানো প্রথম চালানের ডিজেল যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ২ ঘণ্টার চাহিদা মেটাতে সক্ষম। ফলে এই সরবরাহ মার্কিন ভোক্তাদের জন্য তেমন কোনো বড় স্বস্তি নিয়ে আসবে না। সেপ্টেম্বরে মার্কিন বাজারে ডিজেলের খুচরা মূল্য প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির প্রায় দ্বিগুণ।
ব্যবসায়ীদের রুশ ডিজেল না কেনার মূল কারণ
তেল ব্যবসায়ীদের ডিজেল না কেনার প্রধান কারণ হলো আইনি ঝুঁকি ও কঠোর শাস্তি। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সাময়িক ছাড় দিলেও মার্কিন কংগ্রেসে রুশ জ্বালানি আমদানির ওপর জারি থাকা নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
নিউ জার্সির গভর্নর মিকি শেরিল পোর্ট ও টার্মিনাল অপারেটরদের চিঠি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন, এসব জ্বালানিবাহী জাহাজকে যেন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অবৈধ রুশ জ্বালানি বাণিজ্যে যুক্ত হলে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেন তিনি। আইনপ্রণেতারা ব্যাঙ্ক, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও জ্বালানি সরবরাহকারীদের সতর্ক করে বলেছেন, এই জ্বালানি খালাস ও লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তারা দেওয়ানি ও ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারেন।
তাহলে রুশ ডিজেল এখন কোথায় যাচ্ছে?
গত মাসে প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল রাশিয়ার ট্যাঙ্কার ‘তালিসমান’ ও সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ‘লেরুও’। তবে মেরিন অ্যানালিটিক্স ফার্ম কেপলার ও মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত একটি ট্যাঙ্কার ব্রাজিলের দিকে ও অন্যটি ভূমধ্যসাগরের দিকে গতিপথ পরিবর্তন করেছে।
উত্তর আটলান্টিকে থাকা তৃতীয় ট্যাঙ্কারটি তার গন্তব্য ‘নিউ ইয়র্ক’ পরিবর্তন করে ‘অর্ডারের অপেক্ষায়’ হিসেবে সংকেত পাঠাচ্ছে। এ ছাড়া ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে লোড নেওয়া সিশেলে নিবন্ধিত ও নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ট্যাঙ্কার ‘বিস্ট’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে রওনা দিয়ে বর্তমানে ‘আটলান্টিক’ সংকেত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক ও নিষেধাজ্ঞাজনিত আইনি জটিলতার কারণে এই জ্বালানি মার্কিন আটলান্টিক উপকূলে খালাস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
তবে ক্রেমলিন জোর দিয়ে বলেছে যে, চুক্তিটি সঠিক পথেই রয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ দাবি করেছেন, সব ডিজেলই তার ক্রেতা খুঁজে নেবে। অন্যদিকে পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিভ এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোকে ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেন- যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে পাঠানো ট্যাঙ্কারগুলো যথারীতি তাদের পথেই রয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক