তিন বছরের মধ্যে প্রথমবার সুদহার বাড়াল যুক্তরাষ্ট্র
তিন বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো সুদের হার বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভবিষ্যতে আরও সুদহার বাড়ানো হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সময় বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) এক বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সুদহার ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের পরিসর থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশ করা হয়। খবর বিবিসির।
ফেডের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেন, মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি এবং দীর্ঘদিন ধরেই তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার ওপরে রয়েছে। তাই সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি দায়িত্বশীল ও বাস্তবসম্মত।
ফেড সাধারণত মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশ বা তার নিচে রাখার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি এই লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে বলে জানান ওয়ার্শ।
সুদহার বাড়লে ঋণ, বাড়ির বন্ধকি ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের খরচ বাড়ে। তবে একই সঙ্গে সঞ্চয়ের ওপর সুদের হার বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা কমানোর দাবি জানিয়েছিলেন। সিদ্ধান্তের পর তিনি ফেড চেয়ারম্যান ওয়ার্শের প্রতি সমর্থন জানালেও সুদহার নির্ধারণকারী ফেডের বোর্ডকে ‘বিরূপ’ ও ‘রাজনৈতিক’ বলে মন্তব্য করেন।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার কমানোর আহ্বান জানান।
তবে ওয়ার্শ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতি এখনও শক্তিশালী থাকায় ফেড মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিতে পারছে। তার মতে, মূল্যস্ফীতি কমলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন নিম্নআয়ের মানুষ।
মূল্যস্ফীতি বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত সুদহার বাড়ায়। এতে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমে এবং সঞ্চয়ে উৎসাহ বাড়ে। তবে এর ফলে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
নতুন সুদহার বাড়ানোর প্রভাব ইতোমধ্যে ব্যাংকিং খাতেও দেখা গেছে। জেপি মরগান, কেইকর্প ও বিএনওয়াইসহ বড় মার্কিন ব্যাংকগুলো বুধবার তাদের প্রাইম লেন্ডিং রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করেছে। এর ফলে ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত ঋণের সুদ বাড়তে পারে।
বাড়ির ঋণের খরচও গত এক বছরে বেড়েছে। ফ্রেডি ম্যাকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছরের মেয়াদি স্থির সুদের বন্ধকী ঋণের গড় হার বর্তমানে ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ১৫ বছরের ঋণের হার ৬ দশমিক ০৯ শতাংশ।
যেসব বাড়ির মালিক ইতোমধ্যে স্থির সুদের বন্ধকী ঋণ নিয়েছেন, তাদের মাসিক কিস্তিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে না। তবে নতুন বাড়ি কিনতে ঋণ নেওয়া বা পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়নের ক্ষেত্রে খরচ বাড়তে পারে।
সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প ফেডের সমালোচনা করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত সুদহার কমানোর দাবি জানান। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ফেড চেয়ারম্যান ওয়ার্শের ওপর তার আস্থা রয়েছে, তবে ফেডের পরিচালনা পর্ষদ ‘খুব কঠিন’।
ডেমোক্র্যাটরাও সুদহার বাড়ানোর সমালোচনা করেছেন। সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, সুদহার বাড়ার ফলে ঋণের খরচ বাড়বে এবং আরও বেশি মানুষ ঋণের বোঝায় পড়তে পারেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের পর এটিই ফেডের প্রথম সুদহার পরিবর্তন। এর আগে সর্বশেষ ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সুদহার বাড়ানো হয়েছিল।
ফেড চেয়ারম্যান ওয়ার্শ ভবিষ্যতে সুদহার কোথায় যেতে পারে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস দেননি। তবে ফেডের অধিকাংশ নীতিনির্ধারক মনে করছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ সুদহার আরও একবার বাড়িয়ে ৪ থেকে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ করা হতে পারে।
নীতিনির্ধারকদের একটি ছোট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ধারণা, আগামী বছর সুদহার আরও বেড়ে ৪ দশমিক ২৫ থেকে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ হতে পারে। এরপর ২০২৮ ও ২০২৯ সালে সুদহার কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
ফেডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে ২০২৯ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রায় ফিরে আসতে পারে।
ইরান যুদ্ধের পর মূল্যস্ফীতি বাড়ার চাপ শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, অন্যান্য দেশেও দেখা যাচ্ছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত সপ্তাহে সুদহার বাড়িয়েছে এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও বৃহস্পতিবার সুদহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক