পদ্মার জলের ঘ্রাণ আর তাজা ইলিশের গন্ধে চাঁদপুর ঘুরে আসুন
নদীর বুকে যখন সোনালী রোদের ঝিলিক ঠিকরে পড়ে, তখন লঞ্চের বাঁশি জানান দেয় আমরা পৌঁছে গেছি রূপালী ইলিশের শহর চাঁদপুরে। পদ্মা, মেঘনা আর ডাকাতিয়া নদীর জাদুকরী মিতালীতে গড়া এই জনপদ যেন প্রকৃতির এক অপার ক্যানভাস। নদীপ্রেমী আর খাদ্যরসিকদের কাছে চাঁদপুর মানেই অন্যরকম এক ভালোলাগা, যেখানে বাতাসে ভেসে বেড়ায় পদ্মার জলের ঘ্রাণ আর তাজা ইলিশ ভাজার মৌমৌ গন্ধ।
যেভাবে আসবেন ও লঞ্চের আরামদায়ক যাত্রা
ঢাকার সদরঘাট থেকে সকাল ৮:৩৫ মিনিটে যখন লঞ্চটি চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়, তখন এক অন্যরকম শিহরণ কাজ করে মনে। লঞ্চের নন-এসি কেবিনের ভেতরে বসে চারপাশের স্নিগ্ধ পরিবেশ উপভোগ করা যায়। কেবিনগুলোর ভেতরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক পরিবেশ পুরো যাত্রাকে ক্লান্তিহীন করে তোলে।
তিন ঘণ্টার এই লঞ্চ-ভ্রমণে নদীর শীতল হাওয়া আর চারপাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে যায়, তা টেরই পাওয়া যায় না। লঞ্চ থেকে চাঁদপুর ঘাটে নামলেই ইলিশের শহর। লঞ্চ ঘাট থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় চলে আসা যায় ইলিশের বাজারে। সেখান থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই তিন নদীর মোহনা, আর মোহনা থেকে নৌকায় মিনি কক্সবাজার।
ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরে ভোজনবিলাস
ভোরের প্রথম আলোতেই চাঁদপুরের বৃহত্তম ইলিশবাজারে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। চকচকে রুপালি রঙের খাঁটি চাঁদপুরের ইলিশের পাশাপাশি বাজারের বিশেষ আকর্ষণ হলো সুস্বাদু ইলিশের ডিম, যার প্রতি বক্স প্রায় ৪৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকায় কিনতে পাওয়া যায়।
তবে আসল চমক অপেক্ষা করছে বাজারের ঠিক পাশেই নদীর পাড়ের ছোট হোটেলগুলোতে। বাজার থেকে পছন্দ করে তাজা ইলিশ কেনার পর আপনি এই ছোট হোটেলগুলোতে রান্না করিয়ে নিতে পারেন। গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের সাথে সেই মচমচে ভাজা ইলিশ, ইলিশ মাছের ডিম ভাজা সাথে শুকনো মরিচ ভাজা, মসুরির ডালের পাশাপাশি জিভে জল আনা সুস্বাদু ইলিশের লেজা ভর্তা সব মিলিয়ে খাবারের টেবিলে তৈরি হয় এক স্বর্গীয় অনুভূতি। পেটপুরে সেই ভোজের পর বিখ্যাত মেঘনা-পদ্মার চরে কিংবা 'মিনি কক্সবাজার'-এ কাটিয়ে দেওয়া যায় দারুণ একটি দুপুর।
শহরের দর্শনীয় স্থান ও ইতিহাস
পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনা থেকে নৌকায় পাড়ি জমালেই পাওয়া যাবে মেঘনা ও পদ্মার চর। যাওয়ার পথে নদীর বুকে জেলেদের মাছ ধরা, বিশাল জলরাশির কলকল ধ্বনি ও নদীর শীতল বাতাসের অনুভূতি মন ছুঁয়ে যাবে। বালুচরের পাশাপাশি নদীর উত্তাল ঢেউ আপনাকে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে নিয়ে যাবে যেন কক্সবাজার সৈকতে।
এছাড়া চাঁদপুর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে সমৃদ্ধ। এখানে আছে লেকের ওপর নির্মিত ভাস্কর্য ‘অঙ্গীকার’। নদীর মোহনায় ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভাস্কর্য ‘রক্তধারা’। এই শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে ‘ইলিশ চত্বর’। বাংলাদেশের একমাত্র মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটও চাঁদপুরে অবস্থিত।
যেখানে থাকবেন
রাত্রিযাপন করতে চাইলে লঞ্চঘাট থেকে শহরে যেতে অটোরিকশা ভাড়া করতে পারেন। শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল আছে। নদীর পাড়েও কিছু হোটেল আছে, যেখানকার জানালা দিয়ে নদীর অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। সুলভমূল্যে এসব হোটেলে নিরাপদে থাকা যায়।
বিকেল ৫টায় চাঁদপুর ঘাট ছেড়ে লঞ্চটি ঢাকার উদ্দেশ্যে যখন আবার যাত্রা শুরু করে, তখন মনটা আপনার এক অদ্ভুত মায়ায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠবে আপনার। ফেরার পথে লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে আপনি অস্তগামী সূর্যের লাল আলোয় নদীর ঢেউয়ের খেলা দেখতে দেখতে বুকভরা একরাশ শান্তি অনুভূত করতে থাকবেন। নদীর বুক চিরে লঞ্চ যখন এগিয়ে চলে, তখন মনে হয় এই জলের টান, ইলিশের সুবাস আর প্রকৃতির এই মায়াবী রূপ ছেড়ে যেন আসতেই ইচ্ছে করছে না। মন বারবার গলার কাছে এসে আকুল হয়ে বলে ওঠে, বারবার ছুটে আসতে ইচ্ছে করে ইলিশের এই জনপদ

ফিচার ডেস্ক