দৃষ্টিশক্তির আলোয় জীবন বদলানোর কারিগর
সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের বাসিন্দা রহিমা খাতুন (৪৮) বহু বছর ধরে সেলাইয়ের কাজ করে সংসার চালান। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুইয়ে সুতা পরানো, কাপড়ের সূক্ষ্ম নকশা দেখা কিংবা হিসাবের খাতায় সংখ্যা পড়া তার জন্য কঠিন হয়ে উঠতে থাকে। প্রতিদিনের কাজ ধীর হয়ে যায়, আয় কমতে থাকে। তিনি ভাবতেন, হয়তো বয়সের কারণেই এমন হচ্ছে।
একদিন স্থানীয় এক স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে চোখ পরীক্ষা করান রহিমা। মাত্র কয়েক মিনিটের পরীক্ষার পর তিনি একটি রিডিং গ্লাস পান। চশমা চোখে দেওয়ার পর প্রথমবারের মতো স্পষ্ট দেখতে পেয়ে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। সেই দিন থেকে তার কাজের গতি বেড়েছে, আয় বেড়েছে, আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে।
রহিমার গল্পটি ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের লাখো মানুষ প্রতিদিন এমন এক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন, যার সমাধান হতে পারে একটি সাধারণ চশমা। অথচ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ সেই সেবার নাগাল পান না।
স্পষ্ট দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা শুধু একটি স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবিকা, মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই উপলব্ধি থেকেই ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ভিশনস্প্রিং। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি বিশ্বের ১৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের দৃষ্টিশক্তি সংশোধনে সহায়তা করেছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশে ভিশনস্প্রিং প্রায় দুই দশক ধরে কাজ করছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ২.৭ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের দৃষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষ করে ৩৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ কাছের জিনিস স্পষ্ট দেখতে না পারার সমস্যায় আক্রান্ত। এর প্রভাব পড়ে তাদের উৎপাদনশীলতা, আয় এবং পারিবারিক জীবনে।
যখন একজন কৃষক বীজের প্যাকেটের নির্দেশনা পড়তে পারেন না, একজন গার্মেন্টস কর্মী কাপড়ের সূক্ষ্ম ত্রুটি শনাক্ত করতে পারেন না, কিংবা একজন মা সন্তানের পড়াশোনায় সাহায্য করতে পারেন না—তখন বিষয়টি কেবল চোখের সমস্যা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে উন্নয়ন ও অর্থনীতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশে তিনটি উদ্ভাবনী মডেলের মাধ্যমে কাজ করছে। ‘জীবিকা উন্নয়নে রিডিং গ্লাস’ কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে চশমা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ‘ক্লিয়ার ভিশন ওয়ার্কপ্লেস’ উদ্যোগের আওতায় কারখানার শ্রমিকদের কর্মস্থলেই চোখ পরীক্ষা ও চশমা সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ফার্মেসিভিত্তিক বিতরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত ভিশনস্প্রিং বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ মানুষের চোখ পরীক্ষা করেছে এবং ২৮ লাখের বেশি মানসম্মত ও সাশ্রয়ী চশমা বিতরণ করেছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এসব উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৬০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য আয় সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ব্র্যাক, সাজিদা ফাউন্ডেশন, দেশের শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কের মতো অংশীদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
একটি সাধারণ চশমা হয়তো খুব বড় কোনো প্রযুক্তি নয়। কিন্তু একজন মানুষের কাছে এটি হতে পারে নতুন করে কাজ করার সুযোগ, সন্তানের মুখ স্পষ্টভাবে দেখার আনন্দ কিংবা দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার একটি সম্ভাবনার দরজা। আর সেই সম্ভাবনার আলোই দেশের লাখো মানুষের জীবনে পৌঁছে দিচ্ছে ভিশনস্প্রিং।

ফিচার ডেস্ক