তদন্তের অঙ্গীকার ডেমোক্র্যাটদের, নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি ট্রাম্প
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের চরম প্রত্যাখ্যান সামলাতে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; অন্যদিকে বিজয়ী ডেমোক্র্যাটরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তাঁরা আগামী কংগ্রেসে জিনিসপত্রের দাম কমাবেন এবং হোয়াইট হাউসের ভেতরের ‘কার্টেল’-এর বিরুদ্ধে লড়বেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) এবং সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়ার পর ট্রাম্প এখন এক চরম প্রতিকূল ও বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি।
৮০ বছর বয়সী ট্রাম্পের জন্য এই ফলাফল এক ব্যক্তিগত অবমাননার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে; যা তাঁর মেয়াদের বাকি দুই বছরের জন্য তাঁকে এক 'লেম-ডাক' বা ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্টে পরিণত করেছে এবং একই সাথে সার্বিক পরিস্থিতি রিপাবলিকান পার্টির ওপর তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভোটের একদিন পরই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থিতার আগে এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে ভ্যান্স মন্তব্য করেন, ‘এই সংঘাতই ছিল আমাদের হেরে যাওয়ার আসল কারণ।’
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালের মধ্যে সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ৫৪টি আসনের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে এবং প্রতিনিধি পরিষদেও শক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
সিনেটের দুটি আসন—কট্টর রিপাবলিকান ঘাঁটি মিসিসিপি এবং আলাস্কায় এখনও অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং চূড়ান্ত ফলাফলের ঘোষণা বাকি রয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্তের অঙ্গীকার করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, আগামীর নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা মূল জবাবদিহিতা ও জনগণের জন্য সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা নিশ্চিত করার ওপর নজর দেবে।
হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের 'স্পিকার' পদে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করে বুধবার লেখা এক চিঠিতে ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফ্রিজ মন্তব্য করেন, ‘ট্রাম্প কার্টেলের কাছ থেকে দেশজুড়ে যে ব্যাপক দুর্নীতি দেখেছে জনগণ, তা থেকেই স্পষ্ট প্রশ্ন উঠেছে যে কেন সাধারণ আমেরিকানদের সহায়তায় এত কম কাজ করা হয়েছে।
হাকিম জেফ্রিজ আরও যোগ করেন, ‘এই পরিস্থিতির অবসান ঘটছে অবিলম্বে এবং ডেমোক্র্যাটরা এই দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহিতার আওতায় আনবে।’
হোয়াইট হাউসের প্রেস সিডিউল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের কোনো প্রকাশ্য বা সরকারি কর্মসূচির শিডিউল রাখা হয়নি। তবে, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনার আগে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে মস্কো ও কিয়েভের কর্মকর্তাদের অভ্যর্থনা জানানোর কথা রয়েছে।
'সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি'
নির্বাচনের এই শোচনীয় ফলাফলকে ট্রাম্প গায়ে না লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন।
বুধবার নিজের প্রথম জনসমক্ষে উপস্থিতির শুরুর সময়টাতে সাংবাদিকদের কাছে নির্বাচনি আলোচনার বদলে তিনি তাঁর নতুন তৈরি করা ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বলরুমের মার্বেল এবং কারিন্থিয়ান স্তম্ভের প্রশংসা করতেই ব্যস্ত ছিলেন।
তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্স যা বলেছেন তা অনেকটাই সত্যি, কারণ এই যুদ্ধের ফলে পেট্রোলের দাম অনেক বেড়ে যায়—যা জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ে ক্ষুব্ধ ভোটারদের জন্য একটি মূল ইস্যু ছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘তবে একই সাথে, আমাকে যদি এই কাজ আবারও করতে হয়, তবে আমাকে তাই করতে হবে। কারণ দীর্ঘমেয়াদে চিন্তা করলে এটিই একমাত্র উত্তর। আপনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে দিতে পারেন না।’
মঙ্গলবার রাতে ফলাফলের প্রাথমিক আভাস আসার পর ট্রাম্প যে নমনীয় সুর গ্রহণ করেছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে তিনি আরও জানান যে, তিনি ডেমোক্র্যাটদের সাথে মানিয়ে চলবেন; তবে নিজের অপছন্দের যেকোনো বিলে ভেটো দেওয়ার হুমকিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, তাঁর রাজনৈতিক শত্রুরা যদি তাঁকে তৃতীয়বারের মতো ইমপিচ (অভিশংসন) করার চেষ্টা করে, তবে তা ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে ধ্বংস করে দেবে।
তা সত্ত্বেও, তিনি এমন একটি দলের প্রধান হিসেবে থেকে যাচ্ছেন যা এখন এক বিশাল পরাজয়ের ধকল সামলাতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়তে পারে।
নির্বাচনের ফলাফলের ওপর দেওয়া এক মন্তব্যে ফ্লোরিডার রিপাবলিকান গভর্নর রন ডিস্যান্টিস বলেন, ‘বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসে দেশের অনেক অঞ্চলে রিপাবলিকানদের জন্য এটি বলতে গেলে অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার মতো একটি ঘটনা।’
২০২৪ সালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ডিস্যান্টিস উল্লেখ করেন যে, এই সপ্তাহে ফ্লোরিডাই ছিল রিপাবলিকানদের জন্য একমাত্র আশার আলো—যেখানে ট্রাম্প-সমর্থিত বায়রন ডোনাল্ডস রাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হয়েছেন এবং অ্যাশলি মুডি সিনেট আসন ধরে রাখতে পেরেছেন।
রিপাবলিকানদের এই পরাজয় নিয়ে ডিস্যান্টিস বলেন, ‘এই ধাক্কার প্রভাব কেবল দুই বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমাদের খুব বাস্তবসম্মত ও স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে হবে। এটি সম্ভবত একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক