মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে কী কী ক্ষমতা হারাবেন ট্রাম্প?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে অনেক সময় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জন্য রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়। আজ মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হবে। তবে নির্বাচনে হারলেই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের পদ বা নির্বাহী ক্ষমতা চলে যাবে- বিষয়টি এমন নয়। বরং তার ক্ষমতা প্রয়োগের রাজনৈতিক ও আইনপ্রণয়ন-সংক্রান্ত সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষ- প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ও সিনেট। এই দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রভাবও এক রকম নয়। কোন দল কতটি আসন পাবে, তার ওপর নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসন কতটা বাধার মুখে পড়বে।
রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রভাব
বর্তমানে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি এবং সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ বদলাতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক ক্ষমতা হারানো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাহী বিভাগের প্রধান থাকবেন। তবে কংগ্রেসের সহযোগিতা ছাড়া তার নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
১. প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে কংগ্রেসের তদন্ত ও নজরদারির ক্ষেত্রে। বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্যপদে পরিবর্তন আসবে। নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয়, নীতিনির্ধারণ এবং বিভিন্ন সংস্থার কর্মকাণ্ড নিয়ে শুনানি আয়োজন করতে পারবে।
কংগ্রেসের কমিটি প্রয়োজনীয় নথি তলব করতে পারবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শুনানিতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের কংগ্রেসের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে পারে। তবে বাস্তবে সমন বা তলব অমান্য করা হলে তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
২. অভিশংসনের ঝুঁকি বাড়বে, তবে অপসারণ সহজ নয়
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ আনার একক ক্ষমতা প্রতিনিধি পরিষদের হাতে।
তবে অভিশংসন মানেই প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়। প্রতিনিধি পরিষদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অভিশংসনের প্রস্তাব পাস হলে বিষয়টি সিনেটে বিচারপ্রক্রিয়ায় যাবে। সেখানে প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে অপসারণ করতে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। অর্থাৎ শুধু প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হবে না।
৩. বাজেট ও সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে
প্রেসিডেন্টের নীতিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কংগ্রেসের অনুমোদিত অর্থ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি দপ্তর, বিভিন্ন কর্মসূচি, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা রয়েছে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের চাওয়া বাজেট ও ব্যয়ের প্রস্তাব নিয়ে দর-কষাকষি করতে পারবে। প্রশাসনের কোনো কর্মসূচির জন্য অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়া বা শর্ত যুক্ত করার চেষ্টা হতে পারে। এ নিয়ে সমঝোতা না হলে ২০২৭ সালে সরকারি অর্থায়ন নিয়ে অচলাবস্থা এবং শাটডাউনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে রয়টার্সের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. বিচারক ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়োগে বাধা আসতে পারে
ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুপ্রিম কোর্টসহ ফেডারেল আদালতের বিচারক এবং মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু এসব নিয়োগের অনেক ক্ষেত্রেই সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে ট্রাম্পের মনোনীত বিচারক, রাষ্ট্রদূত এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ আটকে দিতে বা দীর্ঘায়িত করতে পারবেন। ফলে প্রশাসনের শূন্য পদ পূরণ এবং বিচার বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না, অনুমোদনের সিদ্ধান্ত সিনেটের হাতে থাকে।
৫. নতুন আইন পাসে বাধার মুখে পড়বে হোয়াইট হাউস
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের নতুন আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বিল আইনে পরিণত হতে হলে সাধারণত প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- দুই কক্ষেই অনুমোদন পেতে হয়। এরপর সেটি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয়।
ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বিল আটকে দিতে পারে। একইভাবে তারা নিজেদের নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে বিল পাসের চেষ্টা করতে পারবে। তবে সিনেটে কোনো বিল পাসের ক্ষেত্রে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরেও প্রক্রিয়াগত বাধা থাকতে পারে। আর প্রেসিডেন্ট কোনো বিলে ভেটো দিলে কংগ্রেসের দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন ছাড়া সেই ভেটো অতিক্রম করা যায় না।
অর্থাৎ কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের পথ সংকুচিত হবে, কিন্তু তার ভেটো ক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকবে।
৬. শুল্ক, অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতিতে কতটা প্রভাব পড়বে?
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং পররাষ্ট্রনীতিও কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা ক্ষমতা এক রকম নয়।
কিছু শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের দেওয়া আইনি ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হয়। আবার অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতির অনেক সিদ্ধান্ত নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে নেওয়া সম্ভব। ফলে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেই ট্রাম্পের শুল্কনীতি বা অভিবাসননীতি সরাসরি বন্ধ করে দিতে পারবে, বিষয়টি এমন নয়।
তবে শুনানি, তদন্ত, বাজেট বরাদ্দ এবং নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এসব নীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেও ট্রাম্পের ভেটো ও নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। ফলে নীতিগত সংঘাত তৈরি হলেও প্রেসিডেন্টের হাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
৭. ট্রাম্পের শেষ দুই বছর হয়ে উঠতে পারে সমঝোতা ও সংঘাতের সময়
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর আগের মতো নির্বিঘ্নে নীতি বাস্তবায়নের সময় নাও হতে পারে। কংগ্রেসের কমিটিগুলো প্রশাসনের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে পারে, বাজেট নিয়ে দর-কষাকষি বাড়তে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
তবে নির্বাচনের ফল অনুযায়ী পরিস্থিতির পার্থক্য হবে। শুধু প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেলে তদন্ত ও বাজেটসংক্রান্ত চাপ বাড়বে। সিনেটও তাদের নিয়ন্ত্রণে গেলে বিচারক ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার সুযোগ বাড়বে। দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কংগ্রেসের সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
ব্রুকিংসের বিশ্লেষক উইলিয়াম গ্যালস্টনের মতে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রশাসনের নীতি ও কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি এবং তদন্তের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা বদলাবে না, ওয়াশিংটনে নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার সম্পর্কেও পরিবর্তন আনতে পারে।
সুতরাং মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ কেড়ে নেবে না; বরং তার প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়াবে এবং আইন, বাজেট ও নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাধা তৈরি করবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক