ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে রাজনীতির অনুপ্রবেশ
বিশ্বকাপকে বলা হয় ফুটবলের সর্বোচ্চ মহোৎসব। কিন্তু ২০২৬ সালের আসর আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, এই মঞ্চে শুধু গোল, ট্রফি কিংবা উদ্যাপনের গল্প লেখা হয় না। পাশাপাশি লেখা হয় যুদ্ধ, রাজনীতি, বৈষম্য এবং মানুষের অদৃশ্য ক্ষতের ইতিহাসও।
সবুজ গালিচায় ফুটবলারদের লড়াই যতটা চোখে পড়ে। তার আড়ালে ক্ষমতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার আরও গভীর এক সংগ্রাম নীরবে চলতে থাকে। ফলে এবারের বিশ্বকাপে ফুটবলের পাশাপাশি ভূরাজনীতিও ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সেই বাস্তবতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে ইরানের যাত্রায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বিধিনিষেধের কারণে দলটিকে অনুশীলনের জন্য মেক্সিকো এবং ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বারবার যাতায়াত করতে হয়েছে। একই সময়ে নিজ দেশে যুদ্ধের বিভীষিকাও তাদের তাড়া করে ফিরেছে।
খেলোয়াড়দের ভাষায়, গোটা বিশ্বকাপ অভিযান ছিল এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা। ইরানের বিদায় তাই অনেকের কাছে একটি দলের পরাজয়ের চেয়েও বড় কিছু, যেখানে ফুটবলের সঙ্গে মিশে ছিল বৈশ্বিক রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা।
অন্যদিকে, মিসরের বিশ্বকাপ অভিযান কোটি মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিল আশা, সাহস ও প্রতিরোধের প্রতীক। আরব বিশ্ব, আফ্রিকা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন যেন জড়িয়ে গিয়েছিল দলটির প্রতিটি ম্যাচে। কোচ ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে সংহতির বার্তা দিয়েছেন, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য আয়োজন করা হয়েছিল বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা। কিন্তু আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগেই সেই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত এক মানবিক কর্মী নিহত হন। ফলে মাঠের বাঁশির শব্দও যেন যুদ্ধের আর্তনাদ থেকে আলাদা হয়ে ওঠেনি।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিতর্কিত পরাজয়ের পর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। রেফারিংয়ের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে মিসর ফুটবল ফেডারেশন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ষড়যন্ত্রের নানা তত্ত্ব। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ওপর সাইবার হামলা এবং ভুয়া বার্তা ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও সেই বিতর্ককে আরও উসকে দেয়। একটি ম্যাচের ফল মুহূর্তেই ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় রূপ নেয়।
পর্দার আড়ালের ক্ষমতার দাপটেরও দেখা মিলেছে। নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্ষমতাবানদের ফোন কলই হয়ে উঠেছিল 'নতুন নিয়ম'। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে লাল কার্ড হজম করা যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোরলান বালোগানের নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল পরের ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ফোন কলেই বদলে যায় সব নিয়ম। মুহূর্তেই স্থগিত হয়ে যায় তার শাস্তির বিধান। প্রতিকার চেয়েও না পাওয়া বেলজিয়ামকে জবাব দিতে হয়েছে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে।
এই বিশ্বকাপ আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবল কখনোই বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অধ্যায় হয়ে ওঠে না। সমাজে যে বিভাজন, রাষ্ট্রে যে সংঘাত, মানুষের মনে যে ক্ষোভ কিংবা বঞ্চনা জমে থাকে, তার প্রতিধ্বনি একসময় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতেও পৌঁছে যায়। তাই একটি বিতর্কিত বাঁশি বা একটি সিদ্ধান্ত অনেক সময় কেবল ম্যাচের গতিপথই বদলায় না, জাগিয়ে তোলে বহুদিনের জমে থাকা অবিশ্বাস, বেদনা ও ক্ষোভ।
শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ বুঝিয়ে দিয়েছে, ফুটবলের সীমানা স্টেডিয়ামের চার দেয়ালে আটকে থাকে না। গোল, জয় কিংবা ট্রফির উল্লাস ছাপিয়ে এই আসর হয়ে উঠেছে যুদ্ধ, মানবতা, রাজনীতি এবং মানুষের আবেগের এক বিস্তৃত ক্যানভাস। তাই এই বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকবে শুধু মাঠের ইতিহাসে নয়, বিশ্বের অস্থির সময়ের এক জীবন্ত দলিল হিসেবেও।

স্পোর্টস ডেস্ক