মিডফিল্ডের দখল হারালে বিপদে পড়বে স্পেন: পেরেজ
ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন ও ফ্রান্স। ইউরোপের দুই ফুটবল পরাশক্তির এই মহারণকে সামনে রেখে ম্যাচের কৌশলগত লড়াই, দুই দলের শক্তি-দুর্বলতা, নজরকাড়া খেলোয়াড় এবং সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন কোচ ও স্প্যানিশ ফুটবলের স্পোর্টিং ডিরেক্টর ফার্নান্দো পেরেজ। স্পেন থেকে হোয়াটসঅ্যাপে এনটিভি অনলাইনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মনিরুল ইসলাম।
বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্স ও স্পেন মুখোমুখি হবে। একজন স্প্যানিশ কোচ হিসেবে এই ম্যাচ নিয়ে আপনার সামগ্রিক মূল্যায়ন কী?
ফার্নান্দো পেরেজ: আমার দৃষ্টিতে এটি এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সবচেয়ে উচ্চমানের ম্যাচ। পুরো বিশ্বকাপজুড়ে দুই দলই নিজেদের স্বকীয় ফুটবল উপহার দিয়েছে। যদিও তাদের খেলার ধর সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্পেন বলের দখল, পজিশনাল প্লে ও দলগত সমন্বয়ের মাধ্যমে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পছন্দ করে। অন্যদিকে ফ্রান্স শক্তিশালী রক্ষণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন এবং দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণের সমন্বয়ে অত্যন্ত কার্যকর ফুটবল খেলেছে। তাই আমি এমন একটি ম্যাচের প্রত্যাশা করছি, যেখানে কৌশলগত লড়াই, ব্যক্তিগত নৈপুণ্য এবং মানসিক দৃঢ়তাই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেবে।
আপনার মতে ম্যাচের ট্যাকটিক্যাল লড়াইয়ের মূল কেন্দ্র কোথায় হবে?
পেরেজ: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হবে মিডফিল্ডে। বিশেষ করে ডিফেন্সিভ ট্রানজিশনের সময়। স্পেন চাইবে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ফ্রান্সকে দ্রুত পাল্টা আক্রমণের সুযোগ না দিতে। অন্যদিকে ফ্রান্স কমপ্যাক্ট রক্ষণে থেকে সঠিক মুহূর্তে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলের গতিকে কাজে লাগিয়ে আক্রমণে উঠবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্পেনের ফুলব্যাকদের পেছনের ফাঁকা জায়গা। প্রতিপক্ষের অর্ধে বল হারালে ফ্রান্স মুহূর্তেই সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। আমার বিশ্বাস, যে দল ট্রানজিশন সবচেয়ে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তারাই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে রাখতে পারবে।
ফ্রান্সকে হারাতে হলে স্পেনের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত কোন বিষয়টিতে?
পেরেজ: প্রথম কাজ হবে ফ্রান্সকে খোলা জায়গায় আক্রমণের সুযোগ না দেওয়া। স্পেনকে ধৈর্য ধরে বল আদান-প্রদান করতে হবে। তবে প্রতিটি পাসের পেছনে স্পষ্ট উদ্দেশ্য থাকতে হবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে বল হারানোর কোনো সুযোগ নেই। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর কাউন্টার-প্রেসিং করতে হবে, যাতে ফ্রান্স দ্রুত আক্রমণে উঠতে না পারে। পাশাপাশি সেট-পিসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নকআউট ম্যাচে অনেক সময় একটি কর্নার বা একটি ফ্রি-কিকই ফল নির্ধারণ করে দেয়। সবশেষে, পুরো ম্যাচজুড়ে মানসিক ভারসাম্য ও মনোযোগ ধরে রাখাও স্পেনের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই ম্যাচে স্পেনের হয়ে সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন কোন খেলোয়াড়?
পেরেজ: আমার মতে, লামিনে ইয়ামালই সেই ফুটবলার। যিনি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। এত অল্প বয়সেই তার সৃজনশীলতা, প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার দক্ষতা এবং চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ। ফ্রান্স যদি ডিফেন্সিভ মুডে খেলে, তাহলে সেই রক্ষণ ভাঙতে এমন একজন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হবে, যিনি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন। ইয়ামাল শুধু গোলের সুযোগ তৈরি করতেই নয়, নিজেও গোল করার সামর্থ্য রাখে। রদ্রি ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করবেন। তবে অপ্রত্যাশিত কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি লামিনের মধ্যেই রয়েছে।
ম্যাচটি যদি অতিরিক্ত সময় বা টাইব্রেকারে গড়ায়, তাহলে কোন দলকে এগিয়ে রাখবেন?
পেরেজ: অতিরিক্ত সময়ে গেলে আমি দুই দলকেই প্রায় সমান সম্ভাবনাময় মনে করি। তবে ম্যাচ যদি টাইব্রেকারে যায়, তাহলে সামান্য হলেও ফ্রান্সকে এগিয়ে রাখব। কারণ তাদের দলে বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বেশ কয়েকজন ফুটবলার রয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নকআউট ম্যাচে তারা মানসিক দৃঢ়তারও দারুণ পরিচয় দিয়েছে।
এই ম্যাচ নিয়ে আপনার ভবিষ্যদ্বাণী কী? সম্ভাব্য স্কোরলাইন কী হতে পারে?
পেরেজ: আমি খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি ম্যাচের প্রত্যাশা করছি। যেখানে পরিষ্কার গোলের সুযোগ খুব বেশি তৈরি হবে না। স্পেন বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে, আর ফ্রান্স ট্রানজিশন থেকে দ্রুত আক্রমণে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে চাইবে। আমার পূর্বাভাস, ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত স্পেন ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেবে। দলগত সমন্বয়, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘ সময় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত স্পেনকে ফাইনালের টিকিট এনে দেবে বলে আমার বিশ্বাস।

স্পোর্টস ডেস্ক