পদক জয়ের সুযোগ কাজে লাগাতে পারল না কাবাডি দল
দুই দশক পর আবারও পদক জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়েছিল বাংলাদেশ পুরুষ কাবাডি দল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। পদক হাতছাড়া হওয়ার পাশাপাশি দলের প্রস্তুতি, পারফরম্যান্স ও পেশাদারিত্ব নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন।
দীর্ঘ দুই দশক পর আবারও এশিয়ান গেমসের মঞ্চে পদক জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে জাপানের কাছে হারের পর সেই সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অন্য ম্যাচের ফলের ওপর নির্ভর করেও সমীকরণ নিজেদের পক্ষে আনতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে পদক ছাড়াই দেশে ফিরতে হচ্ছে পুরুষ কাবাডি দলকে।
বাংলাদেশ ‘এ’ গ্রুপে খেলেছে স্বাগতিক জাপান, ভারত, চাইনিজ তাইপে ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে। চার ম্যাচের সবকটিতে জয় পেয়েছে ভারত। বিপরীতে কোনো ম্যাচেই জিততে পারেনি দক্ষিণ কোরিয়া। বাংলাদেশ, জাপান ও চাইনিজ তাইপে দুটি করে ম্যাচ জেতায় তিন দলেরই পয়েন্ট দাঁড়ায় ৪। ফলে গ্রুপের দ্বিতীয় দল নির্ধারণে জটিল সমীকরণ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও জাপানকে পেছনে ফেলে চাইনিজ তাইপে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করে পদকও।
টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল ২৫ শতাংশ পয়েন্ট অর্জন করতে ব্যর্থ হলে সেই দলের বিপক্ষে ম্যাচের ফল গ্রুপের সেরা দল নির্ধারণের হিসাবের মধ্যে রাখা হবে না। দক্ষিণ কোরিয়া কোনো ম্যাচে প্রয়োজনীয় পয়েন্ট অর্জন করতে না পারায় তাদের বিপক্ষে ম্যাচ বাদ দিয়ে হিসাব করা হয়েছে। ফলে ভারত, চাইনিজ তাইপে ও জাপানের বিপক্ষে বাংলাদেশের তিন ম্যাচের ফল বিবেচনায় আসে। এই তিন ম্যাচে বাংলাদেশ করেছে (১১০) পয়েন্ট, বিপরীতে দিয়েছে (১৩৫) পয়েন্ট। ফলে পয়েন্ট ব্যবধান দাঁড়ায় (-২৫)।
এই হিসাবেই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে যায় চাইনিজ তাইপে। তিন ম্যাচে তারা করেছে (১০২) পয়েন্ট, বিপরীতে দিয়েছে ১১৫। তাদের ব্যবধান (-১৩), যা বাংলাদেশের তুলনায় কম। আজ ভারতের বিপক্ষে ৩৭-২১ পয়েন্টে হেরেছে চাইনিজ তাইপে। সেখানে ভারতের কাছে বাংলাদেশের হার ছিল ৪৮-২৫ পয়েন্টে। ভারতের বিপক্ষে তুলনামূলক বড় ব্যবধানে হারের কারণেও সমীকরণে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে, স্বাগতিক জাপান আজ দক্ষিণ কোরিয়াকে ৬৫-৩২ পয়েন্টে হারিয়েছে। সাধারণ হিসাব করলে এতে জাপানের পয়েন্ট ব্যবধান দাঁড়ায় (+১), যা বাংলাদেশ ও কোরিয়ার চেয়ে ভালো। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচটি হিসাবের বাইরে থাকায় শেষ পর্যন্ত সেই জয় জাপানকে সেমিফাইনালে তুলতে পারেনি। তিন ম্যাচের হিসাব করলে জাপান করেছে (৯৪) পয়েন্ট ও দিয়েছে (১২০), ফলে তাদের ব্যবধান দাঁড়ায় (-২৬)।
পদকের এত কাছে গিয়েও শেষ পর্যন্ত তা হাতছাড়া হওয়ার পর বাংলাদেশের কোচ আব্দুল জলিল বলেন, ‘জাপানের কাছে হারেই মূলত আমরা সমীকরণে পিছিয়ে পড়েছিলাম ও নানা প্রশ্ন আসছে। চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে আরো কিছু পয়েন্ট পেয়ে জিতলে এবং ভারতের কাছে আরো কম ব্যবধানে হারলে সমীকরণে সমস্যা হতো না। আজ ভারত যদি চাইনিজ তাইপেকে আরো বেশি ব্যবধানে হারাত তাহলেও আমরা সেমিফাইনালে উঠতে পারতাম।’
চাইনিজ তাইপেকে হারানোর পর বাংলাদেশ দলের উদযাপনও ছিল বেশ জোরালো। কর্মকর্তাদের কয়েকজন পতাকা হাতে ছবি তুলেছেন, যেন তখনই পদক নিশ্চিত হয়ে গেছে। কিন্তু তখনও জাপানের বিপক্ষে ম্যাচ বাকি ছিল। সেই ম্যাচকে তুলনামূলকভাবে হালকাভাবে নেওয়ার ফলেই বাংলাদেশ হেরেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে কোচ ও খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি স্বীকার করে কোচ জলিল বলেন, ‘চাইনিজ তাইপে ম্যাচটি আমাদের পদকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই জয়ের বহিঃপ্রকাশ অতিরিক্ত হয়েছে। আমরা ডিফেন্স নিয়ে ভুগেছি অনেক। জাপান ম্যাচে ডিফেন্সই কাল হয়ে দাড়িয়েছে।’
গত ১৮ জুলাই একসঙ্গে ২৭টি ফেডারেশনের কমিটিতে পরিবর্তন আসে। কাবাডি ফেডারেশনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ইসরাইল হাওলাদার দলের সামগ্রিক প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্স প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা কয়েকজন খেলোয়াড় পরিবর্তন করতে চেয়ে পারিনি। প্রতিপক্ষ দলগুলো আমাদের চেয়ে আরও বেশি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে।’
তার মতে, প্রস্তুতির পাশাপাশি কাবাডিতে আরও আধুনিক কোচিং পদ্ধতির প্রয়োজন রয়েছে। অন্য অনেক খেলার মতো কাবাডিতেও যোগ্যতা ও সামর্থ্যের চেয়ে কোচদের পছন্দ-অপছন্দের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কোচ আব্দুল জলিল ও বাদশার মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে।
এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতির জন্য কাবাডিতে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন পাওয়া ডিসিপ্লিনগুলোর একটি ছিল। প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে হয়েছে অনুশীলন। আগের কমিটি গেমসের আগে বেশ কিছু প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনাও করেছিল। তবে নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদেশে গিয়ে টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ হয়নি। কাবাডির বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক নেওয়াজ সোহাগের সময়েই মূলত এশিয়ান গেমসকে সামনে রেখে দল গঠন, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের ফলাফল নিয়ে তিনি বলেন, ‘দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে যত্নের সঙ্গে দলগুলো প্রস্তুত করার চেষ্টা ছিল, সকল কাজ পেশাদারিত্বের মাধ্যমে করার চেষ্টা ছিল আমাদের। পদক উদ্ধারের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, আমি এ নিয়ে হতাশ। বাংলাদেশের আরও ইতিবাচক ফলাফল প্রাপ্য ছিল। কেন হয়নি, সমস্যা কোথায়-- এই সম্পর্কে কথা বলা আমার এখতিয়ারবহির্ভূত।'

স্পোর্টস ডেস্ক