কেপ ভার্দে: স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে অসাধ্য সাধনও সম্ভব
‘অঘটন’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ কী? যা হঠাৎ ঘটে, কোনো নিয়ম মেনে ঘটে না—সাধারণত তাকেই আমরা অঘটন বলি। কিন্তু যখন কোনো অঘটন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, যখন অভাবনীয় সাফল্যের গল্পটা বারবার ফিরে আসে, তখন তাকে আর অঘটন বলা যায় কি?
হঠাৎ অঘটনের ব্যাখ্যা নিয়ে পড়ে গেলাম কেনো, সেই প্রশ্নটি মনে আসতেই পারে। এর কারণ হলো আফ্রিকার ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে। একের পর এক যখন বিশ্বমঞ্চে তারা ফুটবল নিয়ে রূপকথার গল্প লিখছে, তখন ‘অঘটন’ শব্দটা বললে যেনো তাদের লড়াইয়ের কৃতিত্বকে ‘অসম্মান’ আর ‘ম্লান’ করা হয়। পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই দেশটির চেয়ে হয়তো বাংলাদেশের অনেক উপজেলায়ও বেশি মানুষের বসবাস আছে।
তবে ফুটবল মাঠে ইতিহাস গড়তে তো আর এতো বেশি জনসংখ্যার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন লড়াইয়ের মনোবল, এক বুক সাহস, উদ্দীপনা আর উজাড় করে দেওয়ার মানসিকতা। বিশ্বমঞ্চে সেটাই করে যাচ্ছে কেপ ভার্দে। তারা এখন বিশ্বের বড় বড় শক্তিধর দলগুলোর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করছে। প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে পা রাখলেও সেটি কেবল অংশগ্রহণ করার জন্য নয়। বরং ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে নিজেদের জানান দিতে এসেছে তারা।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘তোমার লক্ষ্য যত বড় হবে, তোমার জয় ততটাই মহিমান্বিত হবে।’ সেই কংবদন্তির কথাকেই যেন বাস্তবে রূপ দিচ্ছে অখ্যাত থেকে খ্যাতির আলোয় উঠে আসা কেপ ভার্দে। ফুটবল বিশ্বে দলটির ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের পরিচিতি ছিল প্রায় শূন্য। অথচ তারাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ট্রান্সফার মার্কেটের তথ্য অনুযায়ী, পুরো কেপ ভার্দে দলের বাজার মূল্য ৫৪.৫০ মিলিয়ন ইউরো—যেখানে প্রতিপক্ষ স্পেনের শুধু লামিনে ইয়ামালেরই বাজার মূল্য ২০০ মিলিয়ন ইউরো!
বিশ্বকাপের শুরুর ম্যাচেই তাদের প্রতিপক্ষ ছিল স্পেনের মতো পরাশক্তি। তারকাখচিত দল, ইউরো জয়ের আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে স্পেনের জয়টাই ছিল প্রত্যাশিত। ফুটবল বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, এই ম্যাচে কেপ ভার্দের জালে গোলের হালি বসাবে স্পেন। কিন্তু মাঠে ঘটল অন্য কিছু।
মার্কিন দার্শনিক রালফ ওয়াল্ডো ইমারসন বলেছিলেন, ‘ভয়কে জয় করার সেরা উপায় হলো, যে কাজে আপনি ভয় পান, সেই কাজটিই করুন।’ স্পেনের বিপক্ষে ঠিক সেটাই করেছে কেপ ভার্দে। স্প্যানিশদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের ঢেউ যখন তাদের রক্ষণে আছড়ে পড়ছে, তখন তারা ভয়ে কুঁকড়ে না গিয়ে দাঁড়িয়েছে চীনের প্রাচীরের মতো।
আর গোলপোস্টের নিচে যেন দেবদূত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন গোলরক্ষক ভোজিনহো। নিশ্চিত সাতটি গোল আটকে দিয়ে নিজের নামের পাশে যোগ করেছেন ৯.৭ রেটিং। ফুটবল বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে, কীভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে স্পেনের আক্রমণ। এরপর ফুটবলপ্রেমীরা প্রশংসায়ও ভাসিয়েছে ফুটবলের নবাগত এই সৌন্দর্যকে।
তবে অনেকে এই ম্যাচটিকে বিশ্বকাপের ‘বিগ আপসেট’ বা বড় অঘটন হিসেবে বিশেষায়িত করেছিলেন। কিন্তু লোকে কি ভাবল, সেসব দিয়ে তো আর কেপ ভার্দের যায়, আসে না। তারা বরং মাঠের খেলায়ই প্রমাণ করতে চাইল— না, আমরা কোনো অঘটন নয়— ইতিহাস রচনা করতে এসেছি। আমার বিশ্ব বিধাত্রির বিস্ময় হতে এসেছি।
সেই ইতিহাসের দ্বিতীয় কিস্তি এলো উরুগুয়ের বিপক্ষে। সাবেক দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চমকে দিয়ে ইতিহাস লিখে এগিয়ে গেল তারা। ৭ মিনিটের ভুলে পিছিয়ে পড়লেও দমে যায়নি আফ্রিকার লড়াকুরা। বরং আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিরে এসেছে। চমকে দিয়েছে, ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে রুখে দিয়েছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকালে তফাৎটা স্পষ্ট হয়। স্পেন তৃতীয়, উরুগুয়ে ১৯তম—আর সেখানে কেপ ভার্দে ৬৭তম (বর্তমানে ৬৩তম) স্থানে থেকে বিশ্বকাপে পা রেখেছিল। দুই হেভিওয়েট দলের বিপক্ষে টানা এমন দাপুটে পারফরম্যান্সের পর একে আর ‘অঘটন’ বলার সুযোগ কোথায়?
ফুটবল মাঠে নিয়মের চেয়ে আবেগ আর পরিশ্রম অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। কেপ ভার্দে এখন সেই আবেগের নাম। তাদের প্রতিটি ড্র, প্রতিটি পয়েন্ট অর্জন যেন এক একটি মহাকাব্য। দেড় লাখ মানুষের আবেদ আর উচ্ছ্বাসের নাম।
ফুটবলে প্রায় সময়ই বাস পার্কিং অর্থাৎ সবাই মিলে ডিফেন্স করাকে কটু চোখে দেখা হয়। কেপ ভার্দেও হয়তো তাই করছে, কিন্তু কটু কথার পরিবর্তে তারা বরং এখন আদায় করে নিচ্ছে কোটি ফুটবলপ্রমীর উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসা। অবশ্য শুধু বাস পার্কিংয়েই আটকে নেই তারা, সুযোগ পেলেই হানা দিচ্ছে প্রতিপক্ষের রক্ষণে।
দিনটি কেমন যাবে, ভোরের সূর্যই তার বার্তা দেয়। তেমনি কেপ ভার্দে তাদের এই স্বপ্ন যাত্রার বার্তা দিয়েছিল বাছাইপর্বে। আফ্রিকান অঞ্চল থেকে নিজেদের গ্রুপের শীর্ষে থেকেই বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছিল তারা। ১০ ম্যাচের মধ্যে জিতেছিল ৭টিতে, ড্র ২ আর হেরেছিল একটিতে। বাছাইয়েও তাদের ডিফেন্স ছিল চীনের প্রাচীরের মতো। মাত্র ৩টি গোল হজম করেছি তারা। এই যাত্রায় হারিয়েছিল ক্যামেরুনের মতো শক্তিশালী দলকে।
বাছাইয়ের শেষ ম্যাচে এস্তোনিয়াকে হারিয়ে যখন বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে কেপ ভার্দে, তখন রাজধানী প্রিয়াতে জাতীয় পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে এসেছিল হাজার হাজার মানুষ। সারাদেশের মানুষ ভেসেছিল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে। ফুটবলারদের তারা বরণ করে নিয়েছিল ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে। মুলমঞ্চে সেই ভালোবাসারই প্রতিদান দিচ্ছেন ফুটবলাররা।
দুই ম্যাচে ড্র করে ২ পয়েণ্ট নিয়ে টেবিলের তৃতীয় স্থানে রয়েছে কেপ ভার্দে। সুযোগ আছে প্রথম আসরেই নকআউটে খেলার। তাদের এই স্বপ্ন যাত্রা কতদূর গিয়ে থামবে তা, সময়ই বলে দেবে। তবে এই দুই ম্যাচেই তারা যা করেছে, যেভাবে ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসা কুড়িয়েছে সেই পাওয়াই বা কম কিসের।

নাজমুল সাগর