পপ তারকা বনি টাইলার আর নেই
আশির দশকের বিশ্বখ্যাত গান ‘টোটাল ইক্লিপস অব দ্য হার্ট’ ও ‘হোল্ডিং আউট ফর আ হিরো’র কণ্ঠশিল্পী, ওয়েলশ পপ-রক তারকা বনি টাইলার আর নেই। বুধবার (৮ মে) (স্থানীয় সময়) পর্তুগালের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বনি টাইলারের ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর পর্তুগালের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। একই সঙ্গে এই কঠিন সময়ে পরিবারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের বরাতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, পর্তুগালের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন বর্ষীয়ান এই সংগীতশিল্পী। মূলত অন্ত্রের জরুরি অস্ত্রোপচারের পর থেকে কোমায় ছিলেন এবং সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
জানা গেছে, বনি টাইলারের মৃত্যুর মূল কারণ ছিল অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যাওয়া এবং অন্ত্রের গুরুতর জটিলতা; যার কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যগত সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে।
পর্তুগালের আলগার্ভেতে নিজের বাড়িতে থাকাকালীন তিনি তীব্র পেটে ব্যথা অনুভব করেন। ফলে গত মে মাসের শুরুতে তাকে পর্তুগালের ফারো শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে পরীক্ষা করে দেখা যায় তার অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে গেছে এবং অন্ত্র ছিদ্র হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে তার অন্ত্রে জীবন রক্ষাকারী অস্ত্রোপচার করে। তারপরই তিনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং চিকিৎসকেরা তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। এরপর তার শরীরে মারাত্মক ইনফেকশন বা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় এবং তার শরীরকে সুস্থ হতে সাহায্য করতে চিকিৎসকরা তাকে কৃত্রিম উপায়ে কোমায় পাঠান।
গত জুন মাসের মাঝামাঝিতে তিনি কোমা থেকে ফিরে এলেও অত্যন্ত দুর্বল ও অসুস্থ ছিলেন এবং আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর, এই অসুস্থতার জটিলতার কারণেই হাসপাতালের বিছানায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৫১ সালের ৮ জুন ওয়েলসের স্কিউয়েনে গেইনর হপকিন্স নামে জন্মগ্রহণ করেন বনি টাইলার। সংগীতজগতে তার পথচলার সূচনা হয় ট্যালেন্ট স্কাউট রজার বেলের হাত ধরে। ১৯৭৭ সালে ‘লস্ট ইন ফ্রান্স’ গান এবং ‘দ্য ওয়ার্ল্ড স্টার্টস টুনাইট’ অ্যালবাম প্রকাশের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীতাঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই স্বরযন্ত্রে অস্ত্রোপচার করতে হয় বনি টাইলারকে। সেই অস্ত্রোপচারের পর তার কণ্ঠে যে স্বতন্ত্র কর্কশতা তৈরি হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীকালে তার স্বতন্ত্র পরিচয়ে পরিণত হয় এবং বিশ্বসংগীতে তাকে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।
আশির দশকে প্রখ্যাত প্রযোজক ও গীতিকার জিম স্টেইনম্যানের সঙ্গে কাজ শুরু করার পর তার ক্যারিয়ারে আসে বড় মোড়। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত ‘টোটাল ইক্লিপস অব দ্য হার্ট’ গানটি তাকে বিশ্বব্যাপী খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয়। গানটি যুক্তরাজ্যের সে সময়ের সবচেয়ে বেশি বিক্রীত সিঙ্গেলগুলোর একটি ছিল। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিলবোর্ড হট ১০০ তালিকায় টানা চার সপ্তাহ শীর্ষস্থান ধরে রেখে ইতিহাস গড়েন তিনি। এর মাধ্যমে বিলবোর্ডের শীর্ষে ওঠা প্রথম ওয়েলশ শিল্পী হিসেবে নাম লেখান বনি টাইলার।
এর পরের বছরই ‘হোল্ডিং আউট ফর আ হিরো’ গানটি হলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘ফুটলুজ’-এর সাউন্ডট্র্যাকে স্থান পায়। এ ছাড়া ‘হিয়ার শি কামস’সহ তার আরও বেশ কয়েকটি গান বিশ্বজুড়ে সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনবার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন পান এই কিংবদন্তি শিল্পী। ২০১৩ সালে ‘বিলিভ ইন মি’ গান নিয়ে ইউরোভিশন সং প্রতিযোগিতায় যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য বেস্ট ইজ ইয়েট টু কাম’ ছিল তার সর্বশেষ স্টুডিও অ্যালবাম। এরপর ২০২৩ সালে প্রকাশ করেন নিজের আত্মজীবনী ‘স্ট্রেইট ফ্রম দ্য হার্ট’। একই বছর সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ‘মেম্বার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (এমবিই)’ সম্মানে ভূষিত করা হয়।
ব্যক্তিজীবনে ১৯৭৩ সালে ব্যবসায়ী রবার্ট সুলিভানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বনি টাইলার। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের সঙ্গীকে রেখে চিরবিদায় নিয়েছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। তার মৃত্যুতে বিশ্বসংগীত অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

বিনোদন ডেস্ক