অপ্রতিম হত্যা : পুলিশের বক্তব্যে ১২ অসঙ্গতির অভিযোগ শিক্ষার্থীদের
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ সময় কুমিল্লা জেলা পুলিশের সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিংয়ে দেওয়া তথ্য ও তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে ১২টি অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে ধরেন তারা।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে সেখানে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে ‘খুনিদের ফাঁসি চাই’, ‘জাস্টিস, জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজের পর পুলিশি তৎপরতা, মরদেহ উদ্ধারের প্রক্রিয়া, আসামিদের গ্রেপ্তার ও ছেড়ে দেওয়া, তাদের বয়স এবং পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ে দেওয়া তথ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও তাকে খুঁজে বের করতে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও নিখোঁজ অপ্রতিমকে খোঁজার ক্ষেত্রেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।
শিক্ষার্থীদের দাবি, ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার আগেই ঘটনাস্থল ও মরদেহের বিষয়ে পুলিশকে জানানো হলেও পুলিশ সেখানে বেলা ৩টার দিকে উপস্থিত হয়। এ ছাড়া আসামি তুহিনের জবানবন্দিতে অপ্রতিমকে একটি খামারে হত্যার কথা বলা হলেও সেখানে ফরেনসিক টিম যথাযথভাবে আলামত সংগ্রহ ও ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করেনি বলে অভিযোগ করেন তারা।
পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় প্রেস ব্রিফিং হওয়ার কথা থাকলেও পরে সময় পরিবর্তন করে বেলা ১টা করা হয়। তবে পুলিশ নির্ধারিত সময়ের পর সেখানে উপস্থিত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকেরা উপস্থিত হওয়ার আগেই ব্রিফিং শেষ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
আসামি আনাসকে গ্রেপ্তার ও পরে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়েও তদন্ত দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে আনাসকে গ্রেপ্তারের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও পরদিন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করেছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ ঘটনায় কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।
আসামিদের বয়স নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শিক্ষার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে পুলিশের উল্লেখ করা বয়সের পার্থক্য রয়েছে দাবি করে আসামিদের বয়স নির্ধারণে ‘অসিফিকেশন টেস্ট’ করার এবং এর প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।
এ ছাড়া আসামিদের বিরুদ্ধে অতীতে মোটরসাইকেল চুরি ও মামলা থাকার অভিযোগ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখার দাবি জানান তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের ‘কেবিজি’ নামের একটি গ্রুপের সদস্য বলে ধারণা করছেন বলেও জানান শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে কোটবাড়ি ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদকাসক্তদের কার্যক্রম তদন্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি করেন তারা।
শিক্ষার্থীরা বলেন, অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় তাদের দেওয়া ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটামের বিষয়েও পুলিশ সন্তোষজনক কোনো জবাব দেয়নি। পাশাপাশি ১৯ সেপ্টেম্বর দেওয়া চার দফা দাবির বিষয়েও পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ে কোনো বক্তব্য না থাকায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের মূল তদন্তের পরিবর্তে ‘ব্যাড প্যারেন্টিং’ প্রসঙ্গ সামনে এনে ঘটনার দায় অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের দাবি, হত্যার প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং তাদের পেছনে কোনো মদদদাতা রয়েছে কি না—সবকিছু তদন্ত করে প্রকাশ করতে হবে।
কুবির বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহনাজ বলেন, পুলিশ এখানে দ্বিচারিতা করছে। সঠিক তথ্য লুকানোর চেষ্টা করছে। তারা অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে। তা না হলে সংবাদ সম্মেলনে সঠিক তথ্যই দিত।
শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন বলেন, পুলিশ প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করছে না। সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার পার্থক্য আছে। আমরা চাই, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফ হাসান জিদনী বলেন, পুলিশ গতকালের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছে, তারা আনাস নামে কাউকে ধরেনি। তবে হত্যার দিন আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন আনসার ক্যাম্প থেকে আনাস নামে একজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরদিন এসআরবির প্রেস ব্রিফিংয়ে আমরা দেখতে পাই, আনাসকে সকাল সাতটায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তার ও ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে গোপনে তদন্ত করা দরকার। এই হত্যাকাণ্ডে একজন অভিযুক্তের বয়স ১৫ বছর দেখিয়ে তাকে কারাগারে না পাঠিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। তার বয়স কম দেখানোর পেছনে কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।
সাইফ হাসান জিদনী বলেন, বিষয়গুলো ঠিক করতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি টিম গঠন করে তদন্ত করা দরকার, যাতে কোনো অপরাধীকে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া না হয়। অপরাধী কিশোর, যুবক কিংবা বয়স্ক—যেই হোক, গ্রেপ্তারের পর দ্রুত আদালতে পাঠাতে হবে।
১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিম কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন একটি স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। হত্যাকাণ্ডের বিচার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে চার দফা দাবি জানিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

ফরহাদ হিমু, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়