নওগাঁয় ধানের আশানুরূপ দাম না পেয়ে লোকসানের শঙ্কায় কৃষক
নওগাঁয় চলতি রবি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও গত বছরের তুলনায় বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় লোকসানের ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষকেরা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, ধান কাটা শুরু হয়েছে, আপাতত কৃষকরা ধানের দাম ভালো না পেলেও ভরা মৌসুম শুরু হলে দাম বাড়বে।
নওগাঁ জেলায় ১১ উপজেলায় চলতি রবি মৌসুমে এক লাখ ৯২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলায় শুরু হয়েছে বোরো ধান কাটা। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২২ হাজার ৪৮০ মেট্রিক টন। যার চালের আকারে পরিমাণ দাঁড়াবে আট লাখ ৮১ হাজার ৬৫৫ মেট্রিকটন।
বর্তমান ধানের বাজার দর নিয়ে খুশি নন কৃষকেরা। গত মৌসুমে প্রতি মণ ধান এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এ বছর সেখানে এক মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকায়।
রানীনগর উপজেলার বিজয়কান্দি গ্রামের প্রান্তিক কৃষক আবুল কালাম আজাদ, ভাটকই গ্রামের আরেক প্রান্তিক কৃষক বিপথ চন্দ্র প্রামানিক বলেন, জমির মালিকদের কাছ থেকে বার্ষিক ১৪ হাজার টাকা চুক্তিতে জমি লিজ নিয়ে যেসকল প্রান্তিক কৃষক ধান চাষ করেছে তাদের জমি লিজ, জমি প্রস্তুত, বীজতলা তৈরি, জমিতে চারা রোপণ, পানি সেচ, সার-কীটনাশক, পরিচর্চা, ধান কাটা এবং মাড়াই করতে বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ পড়েছে কমপক্ষে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। সেখানে বর্তমানে প্রতি বিঘায় গড়ে ২৫ মণ হারে ধান উৎপাদন হয়েছে। বাজারে ধানের দাম না থাকায় এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার ১০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করলে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষকদের প্রতি বিঘায় লোকসান গুনতে হচ্ছে কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা।
তারা বলেন, রোদ নেই, ধান শুকানোর কোনো উপায় নেই। তার ওপর ধার-কর্জ করে ধান উৎপাদন করায় পাওনাদারদের চাপে মাঠ থেকে তুলে অনেকটা বাধ্য হয়ে ধান বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে তারা পড়েছেন চরম বেকায়দায়।
বাজারে পর্যাপ্ত ধানের আমদানি থাকলেও ধানের দরপতনের কারণ হিসেবে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন বিগত সরকারের অতিরিক্ত আমদানিকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীদের ধান-চাল অবিক্রীত থাকায় বড় বড় ব্যবসায়ী আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের হাতে টাকা না থাকায় তারা হাটে ধান কিনতে যেতে পারছেন না। মূল ধারার ব্যবসায়ীরা কেনা-বেচা শুরু না করলে বাজারে ধানের দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা খুবই কম।
এই ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, অতিদ্রুত সরকারি খাদ্য গুদামগুলো খালি করে কৃষকদের কাছ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধান কেনা শুরু করলে বাজার কিছুটা বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারিভাবে ৩৬ টাকা কেজি দরে কৃষকরা ধান বিক্রি করতে পারলে সব শ্রেণির কৃষক কিছুটা লাভবান হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমাইরা মণ্ডল বলেন, মাত্র ধান কাটা শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত জেলার মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। এ অবস্থায় ভেজা ধান বাজারে বিক্রি করে কৃষকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছে না। তবে, ধান কাটার ভরা মৌসুম শুরু হলে বাজারে ধানের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। কৃষকরা তাদের ধান শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করলে ন্যায্যমূল্য পাবে। এ ছাড়া সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হলে অবস্থার আরও উন্নতি হবে। প্রথম দিকে ধান বিক্রি না করে একটু ধৈর্য ধরে ধান বিক্রি করতে পারলে প্রান্তিক কৃষকসহ সব কৃষক চলতি বছরের বাম্পার ফলনের সুফল ঘরে তুলতে পারবে।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ