মনু প্রকল্পের ভেতর নষ্ট হচ্ছে ধান, দুশ্চিন্তায় কৃষক
মৌলভীবাজার মনু প্রকল্পের ভেতর এ বছর বোরো ধানের ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু টানা কয়েকদিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যায় পাকা ও আধা পাকা ধান। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে জমির ধান তলিয়ে থাকায় পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যারা ধান কেটে এনেছে রোদ না থাকায় সে ধানে অঙ্কুর গজিয়েছে। হাওরপাড়ের মানুষের একমাত্র সম্বল ক্ষেতের ধান হারিয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, হাওর এলাকায় ইতোমধ্যে ৮৭ শতাংশ ধানকাটা শেষ হয়েছে। বাস্তব চিত্র বলছে কাওয়াদীঘি হাওরে ৩০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (৫ মে) রোদের দেখা মেলায় হাওরপাড়ের কৃষদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের কৃষক নুমান মিয়া এ বছর এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ৩০ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেন। স্বপ্ন ছিল ধান বিক্রি করে সংসার চলাবেন এবং ঋণ পরিশোধ করবেন। কিন্তু সে স্বপ্নে মধ্যে আঁধার নেমেছে টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে। হাওরের পাড়ে বসে তাকিয়ে দেখছেন কখন বৃষ্টি থামবে কিংবা প্রকল্পের পাম্প পানি নিষ্কাশন করবে। ভেসে উঠবে তলিয়ে যাওয়া তার জমির ধান।
নুমান মিয়ার মতো কাউয়াদীঘি হাওরের জমির মিয়া, আহাদ মিয়াসহ অন্য কৃষকদের জমির বোরো ধান সপ্তাহের অধিক সময়ে তলিয়ে থেকে পচে যাচ্ছে। কৃষকরা যে ধান সংগ্রহ করেছেন সে ধানগুলো টানা বৃষ্টির কারণে স্তূপে থেকে অঙ্কুর গজিয়েছে। হাওরপাড়ের মানুষের একমাত্র সম্বল ক্ষেতের ধান হারিয়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তার পরও কৃষকরা বোরো ধান সংগ্রহে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতি দিন হাওরে বাড়ছে পানি। যেসব জমির ধান কেটে জমির আইলে মুটি বেঁধে রেখেছিলেন, সে ধান পানির নিচে রয়ে যায়। হাওরের পানিতে নৌকা নিয়ে বুক বা গলা সমান পানির মধ্যে ধান কেটে নিয়ে আসছে। রয়েছে শ্রমিক সংকট, শ্রমিক পেলেও তারা অতিরিক্ত পানিতে নেমে ধান কাটতেও চায় না। যেটুকু ধান মাড়াই শেষে পেয়েছে তার ন্যায্যমূল্য পাবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়।
কয়েক দিনের টানা ভারি বর্ষণের পর রোদের দেখা মেলায় হাওরপাড়ের কৃষদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। হাওর তীরবর্তী এলাকার পাকা ও কাঁচা সড়কে ধান শুকানোর হিড়িক পড়েছে। প্রায় ১০-১২ দিন পর এই প্রথম রোদের দেখা পাওয়ায় ধান ও খড় শুকাতে ব্যস্ততা বেড়েছে কৃষাণ-কৃষাণীর।
জেলার অন্যতম কাউদীঘি হাওর, হাকালুকি হাওর ও হাইল হাওরে টানা ভারি বর্ষণের পর রোদের দেখা মেলায় হাওরপাড়ের বোরো চাষিদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
কাউদীঘির জুমাপুর, মিরপুর, দুর্গাপুর, মজেরপুর, কাদিপুর, অন্তহরি, সোনাপুর, কাশিমপুর, ইসলামপুর, আব্দুল্লাহপুর, জাহিদপুর, বিলবাড়িসহ একাধিক গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন রোদ না থাকায় ধান পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। শুকাতে না পেরে স্তূপ করে রাখা ধান থেকে চারা গজিয়েছে। সেই ধান কৃষকরা শুকাচ্ছে। হাওরজুড়েই কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা ও ধান হারানো বেদনায় কিছুতে থামছে না।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, চলতি বছরে বোরো ধানের আবাদ হাওর এবং নন-হাওর এলাকা মিলিয়ে মোট ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ৩৫ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে দুই হাজার ৪৪২ হেক্টর বোরো ধান। হাওর এলাকায় এলাকায় ইতোমধ্যে ৮৭ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে, বাকি রয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশ।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন ওলিদ বলেন, প্রকল্পের ভেতর কাউয়াদীঘির হাওরে পানি বৃদ্ধি পায় মার্চে বৃষ্টিপাত শুরুর পর থেকে। ওই সময় পাম্প চালিয়ে হাওরের পানি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব ছিল। এপ্রিল মাসের শেষ দিকে বৃষ্টি হয়েছে ২৯০ মিলিমিটার, যা পাম্পের নিষ্কাশন ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এ ছাড়া বিভিন্ন ছড়া দিয়েও প্রকল্পের ভেতর পানি প্রবেশ করে।

এস এম উমেদ আলী, মৌলভীবাজার