কাগজে ১১০ শিক্ষার্থী, বাস্তবে নেই একজনও, শ্রেণিকক্ষে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছাগল!
বিদ্যালয় আছে, ভবন আছে, কাগজে-কলমে ১১০ জন শিক্ষার্থী আর শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘ তালিকাও রয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে মিলল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র—একটি শ্রেণিকক্ষেও নেই কোনো শিক্ষার্থী, বরং শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চজুড়ে ছাগলের বিচরণ ও মলমূত্র! জরাজীর্ণ হোয়াইট বোর্ডে ধুলোবালি আর মাকড়সার জাল। এমন চাঞ্চল্যকর ও অবিশ্বাস্য জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের বাদুরতলা গ্রামের পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।
আজ বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে তালা ঝুলছে এবং অফিস কক্ষও বন্ধ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী কারও দেখা মেলেনি। বেলা ১২টার দিকে তড়িঘড়ি করে প্রধান শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বাচ্চু ও কয়েকজন সহকারী শিক্ষক উপস্থিত হলেও তারা শিক্ষার্থীদের হাজিরা খাতা দেখাতে ব্যর্থ হন। সাংবাদিক উপস্থিতির খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে প্রধান শিক্ষক এক সহকারী শিক্ষকের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে উৎকোচ (টাকা) দেওয়ার অপচেষ্টাও চালান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভুতুড়ে এই বিদ্যালয় পরিচালনা করে প্রতি মাসে সরকারের প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা বেতন-ভাতা উত্তোলন করা হচ্ছে। কোনো স্থানীয় শিশু এখানে পড়ে না। অডিট বা কোনো তদন্ত দল এলে প্রধান শিক্ষক ঝালকাঠি শহর থেকে অটোরিকশা ভাড়া করে বাইরের ছেলে-মেয়েদের এনে সাময়িকভাবে শিক্ষার্থী হিসেবে সাজিয়ে রাখেন।
বিষয়টি স্বীকার করে প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু নিজেই বলেন, ‘স্থানীয় দু-চারজন ছাড়া কেউ আসে না, তাই ঝালকাঠি শহর থেকে গাড়ি ভাড়া করে শিক্ষার্থী আনি।’
এছাড়া বিদ্যালয়টিকে ঘিরে পরিবারতন্ত্র ও অর্থ আত্মসাতের পাহাড়সম অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠাতা আবুবকর সিদ্দিকের পরিবারের পাঁচজন সদস্যই এ স্কুলের বিভিন্ন পদে রয়েছেন। প্রধান শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বাচ্চু তার নিজ ভাইয়ের ছেলে মিজানুর রহমান পারভেজকে পরিচালনা কমিটির সভাপতি বানিয়েছেন।
বিগত দিনের দুই সাবেক সভাপতি হাসনাইন তালুকদার দিবস ও জাহিদুল ইসলাম জাহিদ অভিযোগ করেন, কোনো শিক্ষার্থী না থাকায় এবং তাদের স্বাক্ষর জাল করে সরকারি অনুদানের টাকা তোলায় তারা প্রশাসনিক মহলে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন।
বর্তমান সভাপতি মিজানুর রহমান পারভেজের কাছে বিদ্যালয়ের বেহাল দশা ও স্বাক্ষর জালিয়াতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
এ বিষয়ে রাজাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান জানান, ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে প্রধান শিক্ষককে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে এবং স্কুলটিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আরা মৌরি জানান, ব্যাখ্যার সন্তোষজনক জবাব না পেলে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নাঈম হাসান, ঝালকাঠি (কাঁঠালিয়া-রাজাপুর)