কে এই গাদি আইজেনকোট, যেভাবে হয়ে উঠলেন নেতানিয়াহুর বিকল্প
ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য আইজেনকোটকে বেছে নিয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু কে এই গাদি আইজেনকোট, কীভাবে সামরিক বাহিনী থেকে রাজনীতিতে এলেন তিনি এবং নেতানিয়াহুকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসার পথ কতটা কঠিন তার জন্য?
সামরিক জীবন থেকেই পরিচিতি
গাদি আইজেনকোটের জন্ম ১৯৬০ সালে ইসরায়েলের তিবেরিয়াস শহরে। পরে তিনি দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ইলাতে বেড়ে ওঠেন। ১৯৭৮ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গোলানি পদাতিক ব্রিগেডে যোগ দিয়ে সামরিক জীবন শুরু করেন তিনি।
দীর্ঘ ৪১ বছরের সামরিক জীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন আইজেনকোট। তিনি উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান, সামরিক অভিযানের পরিচালক এবং সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) ২১তম চিফ অব জেনারেল স্টাফ বা সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তার মেয়াদ শেষ হয়।
সেনাপ্রধান থাকাকালে লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং গাজা সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
যেভাবে রাজনীতিতে এলেন
সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর আইজেনকোট সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০২২ সালে তিনি বেনি গান্তজের ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টিতে যোগ দেন এবং দেশটির ২৫তম নেসেট বা পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহু সরকার জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করে। আইজেনকোটও সেই সরকারে যোগ দেন এবং যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে যুদ্ধ পরিচালনা, জিম্মিদের মুক্তি এবং সরকারের নীতিগত অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্যের মধ্যে ২০২৪ সালের জুনে বেনি গান্তজের সঙ্গে তিনিও সরকার ছাড়েন।
পরবর্তী সময়ে গান্তজের সঙ্গে তার রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক দল ইয়াশার প্রতিষ্ঠা করেন।
নেতানিয়াহুর বিকল্প হয়ে ওঠার কারণ কী?
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি।
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট ৫৩টি আসন পায়। অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন চার দলের জোট পায় ৪৮টি আসন। দেশটির ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।
এ অবস্থায় আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের ১৯ জন আইনপ্রণেতা আইজেনকোটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে সমর্থন জানান। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন দেন ৪৬ জন আইনপ্রণেতা।
এরপর ৭ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ আইজেনকোটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।
সরকার গঠনের পথে কী কী চ্যালেঞ্জ?
প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পাওয়ার পর আইজেনকোটের হাতে সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় থাকবে। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে তার সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত, আরব দলগুলোর সমর্থন : আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন। কিন্তু তাদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করলে নিজ জোটের কয়েকটি দলের আপত্তির মুখে পড়তে পারেন তিনি।
দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা : ইসরায়েলের অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলোর সমর্থন পেলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। তবে সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে।
তৃতীয়ত, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রভাব : দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন নেতানিয়াহু। তাঁর লিকুদ পার্টি এখনও পার্লামেন্টের বৃহত্তম একক দল। ফলে সরকার গঠনের আলোচনা সহজ হবে না।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আইজেনকোট ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুকেও সরকার গঠনের সুযোগ দিতে পারেন। উভয় পক্ষ ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আইজেনকোট ক্ষমতায় এলে কী পরিবর্তন হতে পারে?
আইজেনকোটের রাজনৈতিক উত্থান ইসরায়েলের ক্ষমতার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে তার সরকার গঠন এখনও নিশ্চিত নয়।
তিনি অতীতে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে জবাবদিহির বিষয়েও কথা বলেছেন।
তাই তিনি সরকার গঠন করতে পারলে নিরাপত্তানীতি, সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ, জিম্মি ইস্যু এবং যুদ্ধ পরিচালনার প্রশ্নে তার অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে নেতানিয়াহুর নীতির সঙ্গে তার সম্ভাব্য সরকারের নীতির পার্থক্য কতটা হবে, তা নির্ভর করবে জোটের সমঝোতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক