সিনেটে হারের পরও ট্রাম্পের হাতে যেসব ক্ষমতা থাকবে
ডেমোক্র্যাটদের কাছে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা শেষ হচ্ছে না। সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক থাকা থেকে শুরু করে নির্বাহী আদেশ, ভেটো, ক্ষমা প্রদর্শন ও পররাষ্ট্রনীতির অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তার হাতে থাকবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাড়বে বাধা।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়বে এবং বিচারক, রাষ্ট্রদূত ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে। তবে সিনেটে পরাজয়ের অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হারিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের ক্ষমতা আলাদা। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে গেলেও প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক দায়িত্ব ও নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকে। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ট্রাম্পের হাতে বিস্তৃত নির্বাহী ক্ষমতা ও ভেটো দেওয়ার অধিকার থাকবে।
১. নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারবেন
ট্রাম্পের হাতে থাকা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো নির্বাহী আদেশ বা এক্সিকিউটিভ অর্ডার জারি করা। এর মাধ্যমে তিনি ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন দপ্তরকে নির্দিষ্ট নির্দেশনা দিতে এবং বিদ্যমান আইনের আওতায় প্রশাসনিক নীতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তারা সরাসরি প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ জারি করার ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারবে না।
তবে নির্বাহী আদেশেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো আদেশ সংবিধান বা প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে আদালত সেটি স্থগিত বা বাতিল করতে পারে। আবার কোনো আদেশ বাস্তবায়নে নতুন আইন বা অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হলে কংগ্রেসের সহযোগিতা লাগতে পারে।
২. সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক থাকবেন
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট দেশটির সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ফলে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও ট্রাম্প এই দায়িত্ব হারাবেন না।
তিনি সামরিক বাহিনীর পরিচালনা, প্রতিরক্ষা বিভাগের কার্যক্রম এবং সামরিক বিষয়ে নির্বাহী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা রাখবেন।
তবে যুদ্ধ ঘোষণা, সামরিক ব্যয় অনুমোদন এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় সামরিক অভিযান ও প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবে।
৩. ভেটো দিয়ে কংগ্রেসের আইন আটকে দিতে পারবেন
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ট্রাম্পের হাতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে কোনো বিল পাস হওয়ার পর সেটি প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হলে তিনি তাতে স্বাক্ষর করতে পারেন অথবা ভেটো দিতে পারেন।
এমনকি ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ট্রাম্পের ভেটো অতিক্রম করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
অর্থাৎ কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই বিরোধী দল নিজেদের সব প্রস্তাব আইনে পরিণত করতে পারবে না।
৪. বিদেশনীতি ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা, আলোচনা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারবেন।
তিনি বিদেশি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারবেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে পারবেন এবং নির্বাহী চুক্তির মাধ্যমে কিছু আন্তর্জাতিক সমঝোতা করতে পারবেন।
তবে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের জন্য সিনেটের উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো চুক্তি করতে চাইলে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন পাওয়া তার জন্য কঠিন হতে পারে।
৫. শুল্ক ও অভিবাসননীতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন
ট্রাম্পের শুল্ক ও অভিবাসননীতির ক্ষেত্রেও নির্বাহী ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদ্যমান আইনে প্রেসিডেন্টকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার আওতায় তিনি কিছু শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারবেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তারা এককভাবে ট্রাম্পের সব শুল্ক বা অভিবাসন সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবে না।
তবে এসব নীতির আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে, তদন্ত করতে, শুনানি আয়োজন করতে এবং নতুন আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে পারবে কংগ্রেস। রয়টার্সের বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলালেও ট্রাম্পের শুল্ক, অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে।
৬. ফেডারেল অপরাধে ক্ষমা প্রদানের ক্ষমতা থাকবে
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের হাতে ফেডারেল অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষমা করা বা সাজা কমানোর ক্ষমতা রয়েছে। এ ক্ষমতা সিনেটের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
অর্থাৎ সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলেও ট্রাম্প তার সাংবিধানিক ক্ষমতার আওতায় ফেডারেল অপরাধের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন করতে পারবেন।
তবে এই ক্ষমতা রাজ্য পর্যায়ের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। একইভাবে অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরোপিত শাস্তি থেকেও প্রেসিডেন্ট কাউকে ক্ষমা করতে পারেন না।
৭. প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরকার পরিচালনা করতে পারবেন
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প নির্বাহী বিভাগের প্রধান থাকবেন। ফলে তার প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর, সংস্থা ও কর্মকর্তারা প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাবেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও তারা সরাসরি হোয়াইট হাউসের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে পারবে না।
তবে মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়োগে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হওয়ায় নতুন নিয়োগে বাধা আসতে পারে। ফলে প্রশাসনের কিছু পদ পূরণ করতে ট্রাম্পকে অপেক্ষা করতে বা রাজনৈতিক সমঝোতা করতে হতে পারে।
৮. বিশেষ পরিস্থিতিতে সিনেটের অধিবেশন স্থগিত থাকলে নিয়োগ দিতে পারবেন
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে প্রেসিডেন্টকে সিনেটের অধিবেশন চলাকালে কোনো পদ শূন্য হলে তা পূরণের জন্য সাময়িক নিয়োগের একটি বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একে বলা হয় ‘রিসেস অ্যাপয়েন্টমেন্ট’।
তবে এটি সীমাহীন ক্ষমতা নয়। সিনেটের অবকাশকালীন সময়ে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে এ ধরনের নিয়োগ দেওয়া যায় এবং এসব নিয়োগ স্থায়ী হয় না; পরবর্তী সিনেট অধিবেশনের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকে।
অর্থাৎ সিনেটের বিরোধিতা থাকলেও কিছু পরিস্থিতিতে সাময়িক নিয়োগের সাংবিধানিক পথ রয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক