ইন্ডিয়া জোটের ‘জনতার অভিশংসনে’ সিইসি জ্ঞানেশের বিচার দাবি
ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ‘কারচুপি’ করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার ‘অবৈধভাবে’ ক্ষমতায় এসেছে—এমন অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোট দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ‘জনতার অভিশংসন’ সভার আয়োজন করেছে।
লোকসভার সাবেক স্পিকার মীরা কুমারের সভাপতিত্বে প্রকৃত সংসদের কার্যপ্রণালীর আদলে আয়োজিত এই প্রতীকী অনুষ্ঠানে 'প্রস্তাব' উত্থাপন করেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। খাড়গে দাবি জানান, জ্ঞানেশ কুমারকে কেবল অবিলম্বে অপসারণই নয়, বরং তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচার হওয়া উচিত। খবর এনডিটিভির।
একটি মঞ্চের ওপর মীরা কুমারের আসন এবং লনের বসার ব্যবস্থাটি পুরানো সংসদ ভবনের ‘সেন্ট্রাল হল’-এর আদলে সাজানো হয়েছিল, যেখানে অতীতে লোকসভা ও রাজ্যসভার যৌথ অধিবেশন বসত।
প্রস্তাবটি ‘পাস’ হওয়ার আগে সমাপনী বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, ‘২০২৩ সালের আইনের অধীনে প্রাপ্ত আইনি সুরক্ষা তাকে বাঁচাবে—জ্ঞানেশ কুমার যদি এমনটা ভেবে থাকেন, তবে আমি তাকে এই দেশের মানুষের মানসিক অবস্থা বোঝার পরামর্শ দেব। আমরা আপনাকে নিশ্চিত করছি, বিরোধী নেতা ও সাধারণ জনগণ আপনাকে পার পেয়ে যেতে দেবে না।’
রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিকারী দলে পরিণত হওয়া ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’ এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর ধারাবাহিক প্রতিবাদের অংশ হিসেবে দিল্লির রামলীলা ময়দানে পরিকল্পিত ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মহাসমাবেশের ঠিক আগের দিন এই প্রতীকী অধিবেশনে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। ১ নভেম্বরের এই সমাবেশের জন্য অন্যান্য দলগুলোও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের এজেন্ডাকে সমর্থন দিয়েছে; তবে আম আদমি পার্টি (এএপি)-র মতো কিছু দল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা এই জোটের অংশ নয়।
পুরো কার্যক্রমটি রাহুল গান্ধী এবং দলের অন্যান্য অ্যাকাউন্ট থেকে সামাজিক মাধ্যম 'এক্স'-এ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
প্রতীকী অধিবেশনের সূচনা ঘোষণা করে মীরা কুমার বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন যে মানুষের ভোট অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে। যখনই প্রশ্ন তোলা হয়, উত্তরের মধ্যে কোনো স্বচ্ছতা থাকে না। সে কারণেই জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরাতে এই অভিশংসন প্রস্তাব আনা হয়েছে।’ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ উল্লেখ করে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এশিয়া, আফ্রিকার দেশগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং আমাদের গণতান্ত্রিক মডেল অনুসরণ করে।’
মীরা কুমার কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করে বলেন ‘যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তারা আজ কথা বলার সুযোগ পাবেন। ইন্ডিয়া জোটের সদস্য, রাজ্যসভা ও লোকসভার সাংসদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং যেসব নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে, তারা সবাই তাদের মতামত প্রকাশ করবেন।’
উত্থাপিত ছয়টি অভিযোগ
এরপর খাড়গে উঠে দাঁড়িয়ে সেই প্রতীকী প্রস্তাবটি উত্থাপন করে বলেন, ‘ভোটের অধিকার হলো গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক বিষয়। আর আজ তা মারাত্মক হুমকির মুখে। এটি গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সরাসরি নির্দেশে কাজ করছেন।’
মল্লিকার্জুন খাড়গে আরও অভিযোগ করেন, ‘ক্ষমতা ধরে রাখতে শাসকগোষ্ঠী সম্ভাব্য সব ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছে। তারা সাংসদ চুরি করেছে, রাজনৈতিক দল ভেঙেছে, সরকার ফেলে দিয়েছে এবং চুরি করেছে, নির্বাচনি বন্ড স্কিম এনেছে এবং ইডি ও সিবিআইয়ের মতো সংস্থাকে ব্যবহার করেছে। আর এখন শুরু হয়েছে ভোট চুরি।’
প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে খাড়গে পাঠ করেন, “ভারতের ৬০ শতাংশেরও বেশি জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্বকারী 'ইন্ডিয়া' জোটের সদস্য এবং ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর নতুন দিল্লিতে সমবেত নাগরিকবৃন্দ, ভারতের সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের প্রতি তাদের সর্বাত্মক অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে—যা আজ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনাব জ্ঞানেশ কুমারের কর্মকাণ্ডের ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। তাই সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হচ্ছে যে, নিম্নলিখিত অভিযোগগুলোতে তাঁকে ইমপিচ (অভিশংসন) করা হোক।”
এরপর খাড়গে ছয়টি ‘অভিযোগ’ তালিকাভুক্ত করেন- ‘নির্বাচনে কারচুপির ষড়যন্ত্র করা, ১৩.২ কোটি ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া, সংসদের অনুমোদন ছাড়াই ফর্ম ৬ (ভোটার নিবন্ধনের জন্য) পুনরায় সংশোধন করা, ইসিআইএনইটি অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, অন্য দুই কমিশনারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে দূরে রাখা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের নির্দেশে কাজ করা।’
শিক্ষার্থী আন্দোলনের নেত্রী নেহা বোরা ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা পড়া সাধারণ মানুষও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।
কংগ্রেস মূলত একটি ‘প্রতীকী সংসদ’ আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল, যা তারা পরবর্তীতে ‘জনতার অভিশংসন’ হিসেবে নামকরণ করে। প্রকৃত অভিশংসনের জন্য ‘ইন্ডিয়া’ জোট নোটিশ দিলেও তা খারিজ হয়ে যায়, কেননা সংসদের যা সমীকরণ, তাতে তা পাস করানোর মতো পর্যাপ্ত আসন সংখ্যা তাদের নেই।
অন্যদিকে, প্রতীকী সংস্করণের ক্ষেত্রে, দিল্লিতে বৃষ্টির কারণে শুক্রবারের নির্ধারিত অনুষ্ঠানটি দলকে একদিন পিছিয়ে শনিবার করতে হয়েছিল।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক