অর্থনৈতিক লাইফলাইন খুঁজছে ইরান : বিকল্প কি রাশিয়া?
হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন অবরোধের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এখন উত্তরের দেশ রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে ইরান। তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে রেলওয়ে, কাস্পিয়ান সাগরের বন্দর ও মস্কোর সঙ্গে গড়ে ওঠা বাণিজ্য নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করার চেষ্টা করছে তেহরান।
রাশিয়ার সমর্থন ও ক্রমবর্ধমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য
এই সম্পর্কের গুরুত্ব সম্প্রতি আরও স্পষ্ট হয়েছে যখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সেন্ট পিটার্সবার্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে মস্কোর ‘অটল ও অবিচল’ সমর্থনের প্রশংসা করেন।
আরও পড়ুন : ট্রাম্পের বুকে কাঁপন ধরানো ভাষণ দিলেন রাজা চার্লস
আরও পড়ুন : ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ঠেকাতে রাজা চার্লসও একমত, দাবি ট্রাম্পের
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। চলতি বছর এটি আরও ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত রাশিয়ার গম, বার্লি, ধাতু ও যন্ত্রপাতি এবং ইরানের সাশ্রয়ী ড্রোন ও শিল্প পণ্য এই বাণিজ্যের প্রধান অংশ। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া এবং এই যুদ্ধের কারণে ইরান- উভয় দেশই পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় তারা এখন বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম ও বাণিজ্য করিডোর ব্যবহার করছে।
হরমুজ প্রণালির বিকল্প কি সম্ভব?
রাশিয়া ও ইরানের বাণিজ্যের মেরুদণ্ড হলো ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর’। এটি রেলওয়ে ও সড়কপথের একটি নেটওয়ার্ক। যা রাশিয়াকে কাস্পিয়ান সাগর হয়ে ইরানের মাধ্যমে এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পথটি ‘সাময়িক লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
আরও পড়ুন : স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা, কমেছে গ্রাহক
তবে বিশেষজ্ঞরা কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন। সমুদ্রপথের তুলনায় স্থলপথ বা রেলপথে পণ্য পরিবহণ অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। রেল বা সড়কপথ দিয়ে এই বিশাল পরিমাণ বাণিজ্যের ঘাটতি মেটানো স্বল্প সময়ে প্রায় অসম্ভব। এছাড়াও ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তেল। সমুদ্রপথ ছাড়া রাশিয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করার কোনো বাস্তব অবকাঠামো বর্তমানে নেই।
রাশিয়া কি সত্যিই ইরানকে বাঁচাতে চায়?
বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের জন লাফ আলজাজিরাকে বলেন, রাশিয়া নিজেই ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে ইরানে বড় বিনিয়োগ করা তাদের জন্য কঠিন। তবে বিপরীত মতও আছে।
আরও পড়ুন : এবার মার্কিন ভিসা আবেদনে নতুন দুই প্রশ্ন, গড়বড় হলেই বাতিল
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখা রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক। থিঙ্ক মার্কেটসের প্রধান বিশ্লেষক নাঈম আসলাম মনে করেন, ইরান টিকে থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম চড়া থাকবে, যা রাশিয়ার যুদ্ধকালীন অর্থনীতির জন্য সহায়ক। এছাড়া একটি পশ্চিমাদের ঘোর বিরোধী মিত্রকে বাঁচিয়ে রাখা মস্কোর ভূ-রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ।
শেষ পর্যন্ত রাশিয়া ইরানকে কিছু মানবিক ও সীমিত বাণিজ্যিক সহায়তা দিতে পারলেও, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকলে ইরানের বিশাল অর্থনীতির ঘাটতি পূরণ করা মস্কোর পক্ষে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ।
সূত্র : আল জাজিরা ও রয়টার্স।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক