মমতা পদত্যাগ না করলে কী হবে পশ্চিমবঙ্গে?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পর পদত্যাগের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) প্রধান ও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে শেষ পর্যন্ত যদি মমতা পদত্যাগ না করেন সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে কী হবে?
আজ মঙ্গলবার (৫ মে) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (৪ মে) দুপুরেই ভোটের ফল মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যায়। তখনই কৌতূহল তৈরি হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখন লোকভবনে গিয়ে রীতি অনুযায়ী ইস্তফা দেবেন।
আরও পড়ুন : পদত্যাগ করব না, পরাজয়টা ছিল ষড়যন্ত্রের : মমতা
মমতার আগের ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রীরা এই নিয়মই মেনে এসেছেন। কিন্তু দৃশ্যপট বদলে যায় যখন মমতা রাতে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল থেকে বেরিয়ে লোকসভবনে না গিয়ে কালীঘাটে বাড়ির পথে যান। আজ বিকেলে স্পষ্ট ঘোষণা দেন, তিনি ইস্তফা দেবেন না। তার দাবি–তিনি হারেননি। তাই লোকভবনে যাওয়ার প্রশ্নই নেই।
মমতা বলেন, কেন পদত্যাগ করব? আমরাতো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?
মমতা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা না দেন, তা হলে কী ঘটবে পশ্চিমবঙ্গে? কী বলছে সংবিধানের নিয়মাবলি?
আরও পড়ুন : নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় পশ্চিমবঙ্গে ২ জন নিহতের অভিযোগ
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়, এমন পরিস্থিতির কথা নির্দিষ্ট উল্লেখ করে সংবিধানে কিছু বলা নেই। কারণ কোনো মুখ্যমন্ত্রী ভোটে হেরে ইস্তফা দেবেন না, এমন পরিস্থিতির কথা কেউ মনে করেননি। তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞেরা বেশ কিছু ধারণার কথা বলছেন। যা অতীতে কোনো না কোনো রাজ্যে ঘটেছে। কিন্তু ভোটে হেরে যাওয়ার পরেও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা না দেওয়ার নজির দেশে নেই। ফলে মমতা শেষ পর্যন্ত ইস্তফা না দিলে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন নজির তৈরি হবে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৭ মে, বৃহস্পতিবার। ইস্তফা না দিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই দিন পর্যন্ত মমতাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। কিন্তু ৭ তারিখ পেরোলেই তাঁর মুখ্যমন্ত্রীর পদ থাকবে না। ইস্তফা না দিলেও নামের আগে জুড়ে যাবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। ভোটে হারলে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দেওয়াটা নিয়ম নয়। এটি সাধারণভাবে রেওয়াজ, রীতি বা সাংবিধানিক শিষ্টাচার।
যেমন ১৫ বছর আগে ২০১১ সালের ১৩ মে দুপুর ১টা নাগাদ ভোটের ফল স্পষ্ট হওয়ার পরেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজভবনে গিয়ে তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে ইস্তফাপত্র তুলে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি রাজভবন থেকে সরকারি গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের পার্টি অফিসে গিয়েছিলেন দলের গাড়ি চেপে।
আরও পড়ুন : অভিনয় থেকে রাজনীতি : মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে কি বসবেন থালাপতি বিজয়?
বিজেপি নতুন সরকার গঠন করবে। কিন্তু কবে সেই সরকারের শপথ হবে তা মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। তবে সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তৃতা থেকে একটি ইঙ্গিত মিলেছে যে, বিজেপি আগামী শনিবার (৯ মে) রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন শপথগ্রহণের কর্মসূচি করতে পারে। রাজ্য বিজেপির বিভিন্ন সূত্র থেকেও তেমনই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বুধবার রাতে কলকাতায় আসার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের। রাতেই তিনি বিজেপির পরিষদীয় দলের সঙ্গে বৈঠক করে নেতার নাম ঘোষণা করতে পারেন। যিনি পরিষদীয় দলের নেতা হবেন, তিনিই হবেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। তিনিই রাজ্যপালের কাছে গিয়ে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আর্জি জানাবেন। তারপর হবে শপথগ্রহণ। যদি ৮ মে শপথগ্রহণ হয় এক রকম। তা হলে ৭ তারিখে সরকারের মেয়াদ শেষ এবং ৮ তারিখে শপথগ্রহণের মধ্যে কোনো ফাঁক থাকবে না। তা না হয়ে ৯ তারিখ বা তার পরের কোনও দিনে শপথগ্রহণ হলে মধ্যবর্তী স্বল্পসময় রাজ্যপাল পুরো বিষয়টি তত্ত্বাবধান করবেন এবং তা হবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে।
আরও পড়ুন : হারলেন মমতা, ডুবল তৃণমূলও
কলকাতা হাই কোর্টের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে ‘তদারকি’ (কেয়ারটেকার) মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে রাজ্যপাল কাজ চালানোর অনুরোধ করেন। তেমন কেউ না হলে তিনি নিজে এক-দুদিন তদারকি করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করারও সংস্থান রয়েছে। কিন্তু সাধারণত এত কম সময়ের জন্য ‘সংকট’ না-হলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা নাও হতে পারে। তবে সবটাই নির্ভর করছে বিজেপি পরিষদীয় দল শপথের দিনক্ষণ কবে চূড়ান্ত করে তার ওপরে। কিন্তু মমতা ইস্তফা না দিলে কোনো সংকট তৈরি হবে না। কারণ বিধানসভার মেয়াদ শেষের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে।
তবে প্রচলিত ‘রীতি’ না মানায় তাঁর ভাবমূর্তির ওপর কোনো প্রভাব পড়ে কি না, তা সময় বলবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক