ফিফার বাড়তি অর্থ পেতে পারে বাংলাদেশ
ফিফার উন্নয়ন তহবিল থেকে নিয়মিত অর্থ পেয়ে থাকে সদস্য দেশগুলোর ফুটবল ফেডারেশনগুলো, যা নির্দিষ্ট উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ে ব্যবহার করা হয়। এবার সেই নিয়মিত সহায়তার বাইরে সদস্য দেশগুলোর জন্য আরও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের ফুটবলেও।
ফিফার সদস্য দেশগুলোর জন্য বাড়তি অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের মতো ফিফার সদস্য দেশগুলোও অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে আগামী ১৫ অক্টোবর ফিফা কাউন্সিলের বৈঠকে।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনকাকাফের পক্ষ থেকে ফিফার রিজার্ভ থেকে সদস্য দেশগুলোর জন্য মোট ২১০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭-৩০ চক্রে ফিফার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যেককে অন্তত ১০ মিলিয়ন ডলার করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও (বাফুফে) অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক এখনো নিশ্চিত হয়নি।
প্রতি সদস্য দেশকে অন্তত ১ কোটি ডলারের প্রস্তাব
চলতি মাসে উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিন ও কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্টাগলিয়ানি ফিফার ২১১ সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যেককে ২০২৭-২০৩০ চক্রে অন্তত ১ কোটি ডলার (১০ মিলিয়ন) করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এই অর্থ ফিফার বিদ্যমান উন্নয়ন তহবিলের অতিরিক্ত হিসেবে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ফিফার রিজার্ভের স্বতন্ত্র পর্যালোচনারও দাবি জানান তারা।
১৮ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে সেফেরিন (উয়েফা এর সভাপতি) ও মন্টাগলিয়ানি (কনকাকাফ এর সভাপতি) বলেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ফিফার রিজার্ভ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে। প্রস্তাবিত অর্থ বিতরণের পরও পরবর্তী চক্রজুড়ে ফিফার রিজার্ভ ১৫০ কোটি ডলারের বেশি রাখা সম্ভব হবে বলে তারা হিসাব দেন।
তাদের প্রশ্ন ছিল, ফিফার অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের জন্য প্রস্তাবিত বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনার আদৌ প্রয়োজন ছিল কি না।
বাংলাদেশের জন্য কত হতে পারে?
উয়েফা ও কনকাকাফের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে অন্তত ১০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবটি অপরিবর্তিতভাবে অনুমোদিত হলে বাংলাদেশও সেই কাঠামোর আওতায় পড়বে।
তবে ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো স্পষ্ট করেছেন, আর্থিক যাচাই ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের আগে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ককে সদস্য দেশগুলোর জন্য অনুমোদিত অর্থ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
অর্থাৎ, ১০ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য অঙ্ক হলেও এটি এখনো নিশ্চিত বরাদ্দ নয়।
১৫ অক্টোবরের বৈঠকে মিলতে পারে পরিষ্কার ধারণা
ইনফান্তিনোর নির্দেশ অনুযায়ী, ছয়টি মহাদেশীয় কনফেডারেশনের সভাপতিদের তাদের আর্থিক হিসাব, বিভিন্ন অনুমান ও সংশ্লিষ্ট তথ্য ফিফার মহাসচিবের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। ফিফার সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো এসব হিসাব ও অনুমানের যথার্থতা যাচাই করবে।
এরপর আগামী ১৫ অক্টোবর ফিফা কাউন্সিলের বৈঠকে অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ ও বিতরণের সময়সূচি, ফিফার আর্থিক দায়বদ্ধতা ও স্বাধীনতা সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় রিজার্ভের পরিমাণ এবং অর্থ পাওয়ার যোগ্যতা, প্রতিবেদন ও নিরীক্ষার শর্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
কোনো কোনো কনফেডারেশন যদি কাঠামোগত ও প্রমাণযোগ্য অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়ে, তাদের জন্য সহায়তার বিষয়টিও মূল্যায়নে বিবেচনা করা হবে।
পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া গেলে ১৫ অক্টোবরের বৈঠকেই কাউন্সিলের কাছে সুপারিশ দেওয়ার কথা। তা সম্ভব না হলে কাজ শেষ করার জন্য ‘সবচেয়ে কম সময়ের যুক্তিসংগত’ সময়সীমা নির্ধারণ করতে কাউন্সিলকে বলা হবে।
বাতিল বিনিয়োগ পরিকল্পনার পক্ষে ইনফান্তিনো
ফিফার ‘ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ প্রকল্পের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা গত জুলাইয়ে বাতিল করা হয়। উয়েফা, কনকাকাফ ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনসহ কয়েকটি কনফেডারেশন পর্যাপ্ত পরামর্শ না করার অভিযোগ তুলে ওই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিল।
তবে ইনফান্তিনো তার চিঠিতে পরিকল্পনাটির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল ফিফার বিদ্যমান সম্পদ থেকে দেওয়া অর্থের বিকল্প তৈরি করা নয়, বরং এর বাইরে আরও অর্থ সংগ্রহ করে ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়ানো।
ইনফান্তিনোর ভাষায়, ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা বিদ্যমান অর্থায়নের ‘অতিরিক্ত’ অর্থ হিসেবে কাজ করত।
প্রকল্পটি বাতিল হওয়ার পর ফিফার পরিচালনব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে কনফেডারেশনগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও সামনে এসেছে।
বাড়তি অর্থ এলে বাংলাদেশের ফুটবলে সম্ভাবনা
প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের জন্য ফুটবল উন্নয়নে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সম্ভাব্য এই অর্থ অবকাঠামো উন্নয়ন, ফুটবল একাডেমি, বয়সভিত্তিক দল, নারী ফুটবল, কোচিং এবং তৃণমূল পর্যায়ের কার্যক্রমে বিনিয়োগে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে অর্থ কীভাবে এবং কোন কোন খাতে ব্যবহার করা যাবে, তা নির্ভর করবে ফিফার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও অর্থ বিতরণের শর্তের ওপর।
‘যতটা দায়িত্বশীলভাবে দেওয়া সম্ভব, ততটাই’
বাড়তি অর্থের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্ক আগেভাগে ঠিক করে দিতে চান না বলে জানিয়েছেন ইনফান্তিনো। তবে তিনি বলেছেন, ফিফার নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়িত্বশীলভাবে যতটা বেশি অর্থ দেওয়া সম্ভব, তিনি ততটাই দেওয়ার পক্ষে।
তিনি বলেন, অর্থ বিতরণ হতে হবে সবার জন্য ন্যায্য এবং স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য ব্যবস্থার আওতায়।
ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করতে কনফেডারেশনগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাব চাওয়ার কথাও জানিয়েছেন ইনফান্তিনো। একই সঙ্গে তিনি তাদের ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নেওয়া সিদ্ধান্তকে সম্মান করার আহ্বান জানান।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন, মতবিরোধ না থাকাই আস্থা নয়। বরং মতবিরোধের মধ্যেও সরাসরি আলোচনায় বসা, তথ্য ও বাস্তবতার আলোকে প্রস্তাব যাচাই করা এবং প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নেওয়া সিদ্ধান্তকে সম্মান করাই আস্থার প্রমাণ।
ফলে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের নজর এখন ১৫ অক্টোবরের ফিফা কাউন্সিল বৈঠকের দিকে। সেদিনের সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে, বাংলাদেশসহ সদস্য দেশগুলো অতিরিক্ত কত অর্থ পাবে এবং কোন শর্তে সেই অর্থ বিতরণ করা হবে।

স্পোর্টস ডেস্ক