এবার নতুন প্রশ্নের মুখে আনচেলত্তি
চেনা ছন্দ হারিয়ে ধুঁকছে ব্রাজিল ফুটবল দল। সেই দলকে উদ্ধার করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তিকে। তার অধীনে গত দুই দশকের মধ্যে প্রথমবার বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বিদায় নেয় ব্রাজিল। এখন সেলেসাওদের লক্ষ্য ২০৩০ বিশ্বকাপ। কিন্তু সেই যাত্রাটাও সুখকর হয়নি তাদের।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম প্রীতি ম্যাচে হারের শঙ্কা কাটিয়ে শেষ মুহূর্তের গোলে টেনেটুনে ড্র করেছে সেলেসাওরা। আর এর পরই দলের পারফরম্যান্স নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। যদিও সমর্থকদের কিছুটা ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন আনচেলত্তি। তার দাবি, এটি কোনো নতুন চক্রের শুরু নয়, বরং গত বছর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ারই একটা ধারাবাহিকতা মাত্র।
এর আগে ফিফা উইন্ডোর জন্য দল ঘোষণার সময় ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) জানিয়েছিল যে, নতুন ও তরুণ ফুটবলারদের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করাটাই তাদের বর্তমান পরিকল্পনার মূল অংশ। তবে কোচ আনচেলত্তি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, ২০২৫ সালের জুনে যে কাজ তারা শুরু করেছিলেন, মূলত সেই কাজটিকেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এখন তার প্রধান অগ্রাধিকার।
এই মুহূর্তে ব্রাজিলের এমন একটি নির্দিষ্ট ফুটবল খেলার ধারা বা ফিলোসফি তৈরি করা দরকার, যা তাদের ঐতিহ্যবাহী আক্রমণাত্মক ফুটবলের সঙ্গে মানানসই হয় এবং একই সঙ্গে উদীয়মান নতুন প্রতিভাগুলোর জাতীয় দলে উঠে আসার পথকেও সুগম করে।
মাঠের খেলায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রাখা এবং ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে দারুণ আলো ছড়ানো তারকাদের সেরা ছন্দ কাজে লাগানোই এখন ব্রাজিলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পয়েন্ট হারানোর ম্যাচে আরও একবার ব্রাজিলের মাঝমাঠের পুরোনো দুর্বলতা মারাত্মকভাবে ফুটে উঠেছে।
অনেক সময় চাইলেও সেলেসাওরা প্রতিপক্ষের ওপর নিজেদের একক আধিপত্য বা চাপ বজায় রাখতে পারেনি। নরওয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের সেই পুরোনো সমালোচিত ম্যাচের পারফরম্যান্সের সঙ্গেই যেন এই ম্যাচের চিত্রের হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যখন দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের শুরুর একাদশটি গত দুই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রে খেলা বিশ্বকাপের দলটির প্রায় কাছাকাছিই ছিল। অর্থাৎ, কথার কথা বললেও মাঠের বাস্তব চিত্র বলছে—আসলে সত্যিকারের পুনর্গঠিত কোনো দলে তরুণ বা নতুনদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি করা হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে বিশ্বকাপের মূল স্কোয়াডে খেলা অন্তত সাতজন ফুটবলারকে রেখেই একাদশ সাজিয়েছিল ব্রাজিল। তবুও ম্যাচের গতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের প্রবল বেগ পেতে হয়েছে।
ম্যাচ শেষে নিজের সাফাই গেয়ে কোচ আনচেলত্তি বলেন, ‘ম্যাচটি ড্র হয়েছে বলে আমরা এটিকে হার হিসেবে দেখছি না। আমার কাছে মনে হয়, দল চাইলে ম্যাচটি জিততেও পারত। আমাদের সামনে গোল করার ভালো সুযোগ এসেছিল। তবে পিছিয়ে পড়ার পর দল যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেটিও কিন্তু ইতিবাচক। দিনশেষে এই ড্র আমাদের প্রাপ্যই ছিল।’
সমর্থকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে আনচেলত্তি বলেন, ‘আমাদের এখন একটু ধৈর্য ধরতে হবে, কারণ এগুলো আসলে আমাদের চলমান পরীক্ষারই অংশ। স্কোয়াডের যেসব খেলোয়াড় এতদিন কম সুযোগ পেয়েছে, তাদের মাঠে নামিয়ে যাচাই করে দেখতে হবে এবং সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আজকের ম্যাচটি একটি পরীক্ষা ছিল, আগামী ম্যাচটিও আমাদের আরেকটি পরীক্ষা হবে।’
তবে মাঠের খেলায় ব্রাজিলের মাঝমাঠের ফাঁকা জায়গার দুর্বলতা এখনো খুব স্পষ্ট। বল পায়ে থাকা কিংবা না থাকা—উভয় অবস্থাতেই মিডফিল্ডে দানিলো সান্তোস ও ব্রুনো গুইমারেসের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছিল।
বিশেষ করে আক্রমণ শানানোর সময় তাদের প্রায়শই ডিফেন্সের অনেক গভীরে নেমে আসতে হতো, যার কারণে অস্ট্রেলিয়ার কাউন্টার অ্যাটাকের সময় রক্ষণভাগে বিশাল এলাকা ফাঁকা পড়ে থাকত। ফলে টাউনসভিলের এই ম্যাচটি এক পর্যায়ে পুরোপুরি একটি নিয়ন্ত্রণহীন ও রুদ্ধশ্বাস আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের লড়াইয়ে রূপ নেয়।
সমালোচকদের উদ্দেশে ব্রাজিল কোচ বলেন, ‘আমি বারবার বলছি, এটি নতুন কোনো চক্রের শুরু নয়, বরং গত বছর থেকে শুরু হওয়া আমাদের চলমান একটি চক্রেরই ধারাবাহিকতা। আমাদের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো—যারা এতদিন ক্লাবে বা জাতীয় দলে কম খেলার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁদের মাঠে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া।’
তরুণ ফুটবলারদের সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে আনচেলত্তি বলেন, ‘এন্ড্রিক ও এস্তেভাওয়ের মতো দারুণ সম্ভাবনাময় তরুণদের তুলে আনার জন্য আমাদের সুযোগ দিতে হবে এবং আমরা ঠিক সেই পথেই এগিয়ে যাব। সমর্থকদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে। যখন আসল ও আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা শুরু হবে, তখন দেখবেন দল পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।’

স্পোর্টস ডেস্ক