হ্যারি কেইনের পেনাল্টি মিসে বদলে গেলো ইংল্যান্ডের ভাগ্য
বিশ্বকাপজয়ী স্পেন এবং ইংল্যান্ডের পুরুষ জাতীয় ফুটবল দলের মধ্যে এই মৌসুমের ন্যাশনস লিগের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয় দুইদল। লন্ডনের ওয়েম্বলিতে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ইংল্যান্ডকে ৩-২ গোলে হারিয়ে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের জয় পেয়েছে স্পেন। প্রথমে পিছিয়ে পড়েও হ্যারি কেইনের পেনাল্টি মিসের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। উয়েফা নেশন্স লিগে ওয়েম্বলিতে রোমাঞ্চকর এক ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। ম্যাচের শুরুতেই লামিনে ইয়ামালের গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। তবে প্রথমার্ধেই দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাকে ম্যাচ ঘুরিয়ে ২-১ ব্যবধানে লিড নেয় ইংল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধে হ্যারি কেইনের পেনাল্টি মিসের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আবারও স্পেনের হাতে চলে আসে। শেষ পর্যন্ত আলেক্স বায়েনার গোল এবং মিকেল ওইয়ারসাবালের চমৎকার ফিনিশিংয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে স্পেন।
ম্যাচের মাত্র দ্বিতীয় মিনিটেই এগিয়ে যায় স্পেন। নিজেদের ডিফেন্সের কাছে বল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে মার্ক গুয়েহি চাপের মুখে ভুল করলে সেই সুযোগ কাজে লাগান লামিনে ইয়ামাল। বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত ইংল্যান্ডের বক্সে ঢুকে ডান দিক থেকে বাঁ পায়ে শট নেন তিনি। দূরের পোস্ট ঘেঁষে তার শট জালে জড়িয়ে গেলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্পেন।
এরপরও আক্রমণের ধার বজায় রাখে স্পেন। অষ্টম মিনিটে ফাবিয়ান রুইজের ক্রস থেকে ফেরান টোরেস হেড করে বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। ১৬ মিনিটে আবারও গোলের সুযোগ তৈরি করেন টোরেস। থ্রু বল পেয়ে একা গোলরক্ষক জেমস ট্রাফোর্ডের সামনে চলে গেলেও ট্রাফোর্ড দ্রুত এগিয়ে এসে তার শট ঠেকিয়ে দেন। ২৭ মিনিটে রদ্রির পাস থেকে টোরেস আরও একটি সুযোগ পেলেও তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
ম্যাচের ৩৫ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে সমতায় ফেরে ইংল্যান্ড। স্পেন আক্রমণে থাকার সময় বল দখলে নিয়ে দ্রুত আক্রমণে ওঠে স্বাগতিকরা। ইলিয়ট অ্যান্ডারসন বল জিতে অ্যান্থনি গর্ডনের কাছে পাস দেন। গর্ডন বল বাড়িয়ে দেন জুড বেলিংহ্যামের দিকে। বেলিংহ্যাম মাঝমাঠ থেকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আবার গর্ডনকে থ্রু বল দিলে বাঁ দিক দিয়ে ছুটে যাওয়া ইংলিশ ফরোয়ার্ড গোলরক্ষক উনাই সিমনের সামনে চলে যান। এরপর নিচু শটে বল জালে পাঠিয়ে ম্যাচ ১-১ করেন গর্ডন।
সমতায় ফেরার মাত্র চার মিনিট পরই ম্যাচে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। ৪০ মিনিটে নিকো ও’রাইলির ক্রস থেকে হ্যারি কেইন হেড করেন। মার্ক কুকুরেয়া বলটি ঠেকানোর চেষ্টা করলেও তার শরীরে লেগে বলের দিক পরিবর্তন হয়ে জালে ঢুকে যায়। ফলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে কুকুরেয়ার একটি ক্রসের গতি ও দিক বদলে গিয়ে স্পেনের গোলের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠলেও বল ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় ইংল্যান্ড।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫১ মিনিটে বড় সুযোগ পায় ইংল্যান্ড। জুড বেলিংহ্যাম স্পেনের বক্সে বলের দিকে এগিয়ে গেলে রদ্রির চ্যালেঞ্জে পড়ে যান। প্রথমে খেলা চললেও ভিএআর পর্যালোচনার পর ইংল্যান্ডকে পেনাল্টি দেন রেফারি। ৫৪ মিনিটে স্পট কিক নিতে আসেন হ্যারি কেইন। কিন্তু শট নেওয়ার সময় পিছলে গিয়ে বল ক্রসবারে মেরে বসেন ইংলিশ অধিনায়ক। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়, কারণ পিছলে যাওয়ার সময় কেইনের দাঁড়ানো পা আগে বল স্পর্শ করায় স্পেনকে ফ্রি কিক দেওয়া হয়। ফলে ৩-১ করার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে ইংল্যান্ড।
পেনাল্টি মিসের মাত্র ছয় মিনিট পরই ম্যাচে সমতায় ফেরে স্পেন। ৬০ মিনিটে নিজেদের ডিফেন্সে বল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে নিকো ও’রাইলির ভুল পাস থেকে বল দখলে নেয় স্পেন। দানি ওলমো বল বাড়িয়ে দেন আলেক্স বায়েনার কাছে। বায়েনা বক্সের বাইরে জায়গা তৈরি করে প্রায় ২০ থেকে ২৫ গজ দূর থেকে দুর্দান্ত বাঁকানো শট নেন। বল গোলরক্ষক ট্রাফোর্ডের নাগালের বাইরে দিয়ে নিচের কোণায় ঢুকে গেলে ২-২ সমতা ফেরায় স্পেন।
এরপর দুই দলই জয়সূচক গোলের জন্য আক্রমণে ওঠে। ৬৭ মিনিটে জুড বেলিংহ্যাম কয়েকজন স্প্যানিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে বক্সের কাছে পৌঁছে বুকায়ো সাকার দিকে বল বাড়িয়ে দেন। সাকা বাঁ পায়ে শট নিলেও তা অল্পের জন্য দূরের পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়।
ম্যাচের ৭৪ মিনিটে অবশেষে জয়সূচক গোলটি পায় স্পেন। মাঝমাঠ দিয়ে বল এগিয়ে আলেক্স বায়েনার কাছে দেন ফাবিয়ান রুইজ। বক্সের ঠিক বাইরে বল নিয়ন্ত্রণ করে বায়েনা ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের ফাঁক খুঁজে বের করেন এবং সেই ফাঁক দিয়ে মিকেল ওইয়ারসাবালের উদ্দেশে নিখুঁত থ্রু বল বাড়িয়ে দেন। বক্সের ভেতরে বল পেয়ে সামনে এগিয়ে আসা ট্রাফোর্ডকে দেখে ওইয়ারসাবাল চমৎকার চিপে বল গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে জালে পাঠান। এতে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্পেন।
শেষ দিকে ইংল্যান্ড সমতা ফেরানোর জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণে ওঠে। ৭৮ মিনিটে বায়েনার পাস থেকে ইয়ামাল আরও একটি সুযোগ পেলেও শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর জুড বেলিংহ্যামও একাধিকবার আক্রমণ তৈরি করার চেষ্টা করেন। ৮৯ মিনিটে জারাড ব্র্যান্থওয়েটকে মাঠে নামিয়ে আক্রমণের চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করেন ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল। অতিরিক্ত সময়েও ফ্রি কিক ও আক্রমণের মাধ্যমে সমতা ফেরানোর চেষ্টা চালায় স্বাগতিকরা। তবে স্পেনের রক্ষণভাগ শেষ পর্যন্ত সব প্রচেষ্টা প্রতিহত করে।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ৩-২ গোলের জয় নিশ্চিত হয় স্পেনের। ম্যাচে স্পেনের হয়ে গোল করেন লামিনে ইয়ামাল, আলেক্স বায়েনা ও মিকেল ওইয়ারসাবাল। ইংল্যান্ডের হয়ে গোল করেন অ্যান্থনি গর্ডন ও হ্যারি কেইন। তবে কেইনের ৫৪ মিনিটের পেনাল্টি মিস ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে থাকে।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে স্পেন তাদের অপরাজিত থাকার ধারাও ৩৯ ম্যাচে নিয়ে গেছে। দুইবার পিছিয়ে পড়ার পরও ম্যাচে ফিরে এসে জয় তুলে নেওয়ায় ওয়েম্বলিতে স্পেনের এই জয় হয়ে থাকল ন্যাশন্স লিগের অন্যতম রোমাঞ্চকর প্রত্যাবর্তনের ম্যাচ।

স্পোর্টস ডেস্ক