১৯ বছর বয়সেই ‘সব দেখা’ শেষ ইয়ামালের!
ক্যারিয়ারে ৪১টি ট্রফি, অসংখ্য রেকর্ড আর ব্যালন ডি’অর—২০২২ সালের আগে মেসির ট্রফি ক্যাবিনেটে কিসের অভাব ছিল? কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর কথাই ধরুন, ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে জেতেননি এমন কিছু নেই। একমাত্র ফুটবলার হিসেবে এক হাজার গোলের চূড়ার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। তবুও ফুটবল বোদ্ধাদের আড্ডায় বারবার একটা প্রশ্নই উঠত—তাদের ক্যারিয়ার কি আসলেই পূর্ণতা পেয়েছে?
উত্তরটা ছিল ‘না’। কারণ ২০২২ সালের আগে মেসির জীবনে সবচেয়ে বড় অপূর্ণতার নাম ছিল বিশ্বকাপ। আর সেই একই অধরা স্বপ্নের পেছনে আজও ছুঁটে বেড়াচ্ছেন রোনালদো। অধরা স্বপ্ন পূরণে শেষবার চেষ্টা চালাতেই বোধহয় গুঞ্জন থাকা সত্ত্বেও বিদায়ের ঘোষণাটা দিলেন না রোনালদো।
কিন্তু ফুটবলের নিয়তি বোধহয় মাঝে মাঝে রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর স্ক্রিপ্ট লেখে। এবার চোখ ফেরানো যাক স্পেনের বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালের দিকে। বয়সটা সবে ১৯। কৈশোরের চপলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কিন্তু এই বয়সেই ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুই শিরোপার গল্পে নিজের নাম লিখে ফেলেছেন তিনি। ক্যারিয়ারের শুরুতেই জিতেছিলেন ইউরো, আর এবার উঁচিয়ে ধরলেন ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সোনালি ট্রফিটি।
বিশ্বকাপের শুরুতেই একটি ছবি নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা চলছিল। ২০০৮ সালের সেই ছবিতে ছোট্ট ইয়ামালকে গোসর করিয়ে দিচ্ছিলেন লিওনেল মেসি। ম্যাচ শেষে আরেকটি মুহূর্ত আবারও ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে আলোচনার জন্ম দিল। ম্যাচ শেষে কাঁদতে থাকা লিওনেল মেসিকে জড়িয়ে ধরেন স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল। অনেকের চোখে এটি ছিল এক যুগের অবসান এবং আরেক যুগের সূচনা।
৩৯ বছর বয়সী মেসি দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন গ্যালারিতে থাকা আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দিকে। হয়তো এটাই ছিল বিশ্বকাপ মঞ্চে তার শেষ যাত্রা। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে সান্ত্বনা দেন মাত্র ১৯ বছর বয়সী ইয়ামাল, যিনি এখন বিশ্ব ফুটবলের নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় স্পেন। এর মাধ্যমে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে তারা। আর এই জয়ের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের আধিপত্য আরও দৃঢ় করে স্পেন।
ইয়ামালের জন্য এটি এক ঐতিহাসিক অর্জন। মাত্র ১৯ বছর ৬ দিন বয়সে ইউরো ও বিশ্বকাপ জেতা সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলার তিনি। তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে জানিয়েছেন, দলের জন্য অসাধারণ পারফর্ম করেছেন এই তরুণ।
পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই অপরাজিত ছিলেন ইয়ামাল। দেশের হয়ে খেলা ২৮টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে এখনো হারেননি তিনি। বড় টুর্নামেন্টে শুরু করা ১৩টি ম্যাচের প্রতিটিতেই জয় পেয়েছেন তার দল। যা ইউরোপিয়ান ফুটবলারদের মধ্যে অনন্য রেকর্ড।
ফাইনালে স্পেনের শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কৌশলী ফুটবলের বিপরীতে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ও শারীরিক ফুটবলে ঝুঁকে পড়ে তারা। যা শেষ পর্যন্ত দলের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়।
পুরো ম্যাচে গোলমুখে কোনো শটই নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে, স্পেন লক্ষ্যভেদী শট নিয়েছে ১২টি। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার ফাউলের সংখ্যা ছিল তাদের আক্রমণভাগে দেওয়া পাসের চেয়েও বেশি।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেসের লাল কার্ডে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। এতে আরও কঠিন হয়ে যায় তাদের জন্য ম্যাচে ফেরা। শেষ বাঁশির পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের আগ্রাসী আচরণ পুরো ঘটনাকে আরও জটিল করে তোলে।
ম্যাচ শেষে হতাশায় ভেঙে পড়েন মেসি। তার চোখে জল, পাশে কাঁদছেন সতীর্থরাও। এই দৃশ্য যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশ্বকাপে মেসির সোনালি অধ্যায় হয়তো এখানেই শেষ।
অন্যদিকে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ ও ইউরো জিতে ইয়ামাল যেন ফুটবলের সব বড় স্বপ্নই পূরণ করে ফেলেছেন। তার সামনে এখন দীর্ঘ ক্যারিয়ার। ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষায়, এই নতুন তারকা আর কতদূর এগিয়ে যান।

স্পোর্টস ডেস্ক