রেকর্ডের গণ্ডি পেরিয়ে এক মহাকাব্যের নাম সোবার্স
বার্বাডোসের ছোট্ট এক দ্বীপে জন্ম নেওয়া এক কিশোরের স্বপ্ন একদিন ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো ক্রিকেট বিশ্বে। সেই কিশোরই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার স্যার গারফিল্ড সোবার্স। ব্যাট হাতে সৌন্দর্য, বল হাতে বৈচিত্র্য, আর মাঠজুড়ে দুর্দান্ত উপস্থিতি তাকে পৌঁছে দিয়েছিল অনন্য এক উচ্চতায়। তার ক্যারিয়ার রেকর্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও ক্রিকেটীয় পরিপূর্ণতার এক অনবদ্য উপাখ্যানে রূপ নিয়েছে।
১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই ক্যারিবীয় দ্বীপ রাষ্ট্র বার্বাডোসের রাজধানী ব্রিজটাউনে জন্মগ্রহণ করেন গারফিল্ড সেন্ট অবার্ন সোবার্স। সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে ওঠা এই বিস্ময়বালকের শৈশব কেটেছে ক্রিকেটের প্রতি অদম্য ভালোবাসা নিয়ে। খুব অল্প বয়সেই স্থানীয় মাঠে ব্যাট ও বল হাতে নিজের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক এবং ১৭ বছর বয়সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
সোবার্স ছিলেন এমন একজন ক্রিকেটার। যাকে কোনো একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন ব্যাটসম্যান, বোলার, ফিল্ডার, সব মিলিয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ ক্রিকেটার। বাঁহাতি ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করত, তেমনি পেস, বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিন ও চায়নাম্যানসহ বিভিন্ন ধরনের বোলিং করার বিরল সামর্থ্য তাকে করে তুলেছিল প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মাঠে তার উপস্থিতিই বদলে দিতে পারত ম্যাচের চিত্র।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে কিংস্টনে খেলেন ৩৬৫ রানের অপরাজিত এক ঐতিহাসিক ইনিংস। তখন সেটিই ছিল টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। টানা ৩৬ বছর অটুট ছিল সেই রেকর্ড। ইনিংসটি শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, ব্যাটিং নৈপুণ্যের কারণেও ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
পরিসংখ্যানেও সোবার্স অনন্য। ৯৩টি টেস্টে ৮ হাজার ৩২ রান, ২৬টি সেঞ্চুরি এবং ২৩৫টি উইকেট তার বহুমুখী সামর্থ্যের প্রমাণ। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২৮ হাজার ৩১৪ রান করার পাশাপাশি নিয়েছেন ১ হাজার ৪৩টি উইকেট। ব্যাট ও বল, দুই বিভাগেই এমন সাফল্য খুব কম ক্রিকেটারের ভাগ্যে জুটেছে।
১৯৬৮ সালে ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে এক ওভারে ছয় বলে ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে আরেকটি ইতিহাস গড়েন সোবার্স। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এই কীর্তি গড়া প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে তার নাম আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। সেই ইনিংস ক্রিকেট বিশ্বের বিস্ময়ের অন্যতম অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
সোবার্সের প্রভাব কেবল মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ ছিল না। এমন এক সময়ে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিজেদের শক্তিশালী ক্রিকেট পরাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলছিল। তার সাফল্য ক্যারিবীয় অঞ্চলের অসংখ্য তরুণকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। ছোট একটি দ্বীপ থেকেও বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করা সম্ভব, সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় প্রতীক ছিলেন তিনি।
১৯৬৫ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সোবার্স। নেতৃত্বে সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ দুটিই ছিল, তবে তার ব্যক্তিত্ব, সাহস ও ক্রিকেটীয় প্রজ্ঞা সবসময় সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করেছে। ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। পরে উইজডেন তাকে বিংশ শতাব্দীর সেরা পাঁচ ক্রিকেটারের একজন হিসেবে নির্বাচিত করে।
স্যার গারফিল্ড সোবার্সের নাম উচ্চারিত হয় ক্রিকেটের পরিপূর্ণতার প্রতীক হিসেবে। নতুন প্রজন্ম তার খেলা দেখবে সংরক্ষিত ভিডিওতে, তার রেকর্ড পড়বে ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু তার মতো বহুমাত্রিক প্রতিভার ক্রিকেটার খুব কমই জন্ম নেয়। ক্রিকেটের আকাশে অসংখ্য তারকা জ্বলবে, তবু সোবার্সের দীপ্তি চিরকালই থাকবে স্বতন্ত্র, অনন্য এবং অমলিন।

স্পোর্টস ডেস্ক