মেসিকে ঘিরে স্পেনের চিরকালীন আক্ষেপ!
ধরুন, ইতিহাস একটু অন্যভাবে লেখা হতো। লিওনেল মেসির গায়ে যদি আকাশি সাদা জার্সির বদলে উঠত স্পেনের লাল জার্সি। বিশ্বকাপ, ইউরো কিংবা ফুটবল ইতিহাসের কত অধ্যায়ই হয়তো অন্য রূপ পেত। প্রশ্নটি আজও কৌতূহল জাগায়। কারণ এক সময় সত্যিই স্পেন মরিয়া হয়ে চেয়েছিল মেসিকে নিজেদের করে নিতে। অথচ পৃথিবী তখনও জানত না, ক্ষীণদেহী সেই কিশোর অনেক আগেই নিজের ভবিষ্যতের ঠিকানা ঠিক করে ফেলেছে। সুযোগ, স্বপ্ন আর নিশ্চিত সাফল্যের সব হাতছানি ছাপিয়ে তার হৃদয়ে তখন একটিই নাম লেখা ছিল, আর্জেন্টিনা।
২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে রোজারিও ছেড়ে চিকিৎসার আশায় বার্সেলোনায় পাড়ি জমান মেসি। গ্রোথ হরমোনের ব্যয়বহুল চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় বার্সেলোনা, পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, বাবার চাকরির ব্যবস্থাও করে। লা মাসিয়ার অনুশীলন মাঠে প্রতিদিন একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল এক বিস্ময়। বল যেন তার পায়ে লেগে থাকত। সময় যেন তার ইচ্ছেমতো চলত। খুব অল্প সময়েই স্পষ্ট হয়ে যায়, ফুটবল পেয়েছে এক অনন্য প্রতিভা।
মেসির প্রতিভা প্রথম গভীরভাবে চিনেছিল স্পেনের কোচরাই। যুব দলের কোচ গিনেস মেলেন্দেস তাকে দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে বলেছিলেন, এই ছেলেকে পেলে ভবিষ্যতের স্পেনকে হারানো কঠিন হবে। বার্সেলোনার যুব কোচ অ্যালেক্স গার্সিয়াও বিশ্বাস করতেন, আর্জেন্টিনা যখন তার খোঁজ নিচ্ছে না, তখন মেসিকে স্পেনের জার্সিতে দেখা অসম্ভব কিছু ছিল না।
এরপর শুরু হয় নীরব প্রচেষ্টা। কখনও পরিবারের সঙ্গে কথা বলে, কখনও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে, কখনও বন্ধুসুলভ কথায়। অ্যালেক্স গার্সিয়া একদিন মেসিকে বলেছিলেন, ‘তোমার বন্ধুরা সবাই নিজেদের দেশের হয়ে খেলতে চলে যায়। তুমি স্পেনের হয়ে খেললে আর একা থাকতে হবে না।’ কথাগুলো ছিল আন্তরিক। কিন্তু মেসির উত্তর এসেছিল হৃদয় থেকে। তিনি জানতেন, তার স্বপ্নের রং কেমন।
মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তুললে সেটি হবে শুধু আর্জেন্টিনার। পরে আর্জেন্টিনার সংবাদপত্র লা নাসিওন এ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে লিখেছিলেন, স্পেনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল, কিন্তু তার উত্তর সবসময় একই ছিল। তিনি খেলতে চান আর্জেন্টিনার হয়েই। জন্মভূমির আকাশি সাদা রংয়ের সঙ্গে কোনো আপস করার প্রশ্নই ওঠেনি।
এদিকে আর্জেন্টিনা তখনও বুঝতে পারেনি, কী হারাতে বসেছে। শেষ পর্যন্ত মেসির খেলার একটি ভিডিওচিত্র পৌঁছে যায় জাতীয় দলের কোচ মার্সেলো বেলসা ও তার সহকারী ক্লদিও ভিভাসের হাতে। ভিডিও দেখে তারা বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যান। দ্রুত বার্সেলোনায় পাঠানো হয় জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান। মজার বিষয়, সেই ফ্যাক্সে মেসির নামও ভুল লেখা হয়েছিল, লিওনেল মেচ্চি। বানানে ভুল ছিল, কিন্তু সেই ডাকই ফুটবল ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।
মেসির ফুটবল যেন দুই সংস্কৃতির এক অনন্য মিলন। স্পেন তাকে শিখিয়েছে বলের নিয়ন্ত্রণ, ফাঁকা জায়গা তৈরি করার শিল্প, ধৈর্য, ছন্দ আর দলগত ফুটবলের সৌন্দর্য। আর্জেন্টিনা দিয়েছে সৃজনশীলতা, ড্রিবলিংয়ের জাদু, প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগুন আর জয়ের ক্ষুধা। তাই তার প্রতিটি স্পর্শে লা মাসিয়ার শিক্ষা, প্রতিটি দৌড়ে রোজারিওর মাটির গন্ধ। মনে হয়, তিনি স্পেনের মতো ভাবেন, আর্জেন্টিনার মতো খেলেন।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে নিজের বন্ধু আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাকে কাটিয়ে গোল করার পর ইনিয়েস্তা হেসে বলেছিলেন, ‘সৌভাগ্য যে সে আমার সতীর্থ। প্রতিপক্ষ হলে এমন বিব্রতকর মুহূর্ত সহ্য করা কঠিন হতো।’ স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী কোচ ভিসেন্তে দেল বস্কের আক্ষেপও ছিল একই সুরে, ‘ইশ, যদি সে আমাদের হয়ে খেলত!’
ইতিহাস অবশ্য অন্য গল্পই লিখেছে। স্পেন মেসির প্রতিভাকে শাণিত করেছে, বিশ্বজয়ের মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছে। আর্জেন্টিনা তাকে দিয়েছে পরিচয়, আবেগ আর শিকড়ের টান। তাই লিওনেল মেসির নাম উচ্চারিত হলেই দুটি দেশের গল্প পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়। একটি দেশ তাকে বিশ্বসেরা করেছে, আরেকটি দেশ তাকে নিজের মানুষ করে রেখেছে। সেই কারণেই তার হৃদয়ের ঠিকানায় সবসময় একটিই নাম লেখা থাকে, আর্জেন্টিনা।

স্পোর্টস ডেস্ক