ফারাওদের সামনে বেলজিয়ামের সোনালি ঢাল
বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও বাজতে যাচ্ছে মহারণের দামামা। গ্রুপ ‘জি’-র অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের শক্তিশালী দল বেলজিয়াম ও আফ্রিকার পরাশক্তি মিসর। একদিকে টানা ১৩ ম্যাচ অপরাজিত থেকে দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত ‘রেড ডেভিলস’রা, অন্যদিকে মোহাম্মদ সালাহর নেতৃত্বে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের প্রথম জয়ের স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাঠে নামবে ‘ফারাও’রা। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের এই লড়াইয়ে তাই প্রত্যাশা, উত্তেজনা আর নতুন ইতিহাস গড়ার আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে তৈরি করেছে দারুণ এক আবহ।
রুডি গার্সিয়ার অধীনে যেন নতুন করে নিজেদের খুঁজে পেয়েছে বেলজিয়াম। ২০২৫ সালের শুরুতে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শুধু দলকে উয়েফা নেশনস লিগের শীর্ষ স্তরে টিকিয়েই রাখেননি, বরং অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব পার করে দিয়েছেন। বাছাইপর্বে ২৯ গোল করা বেলজিয়াম ছিল ইউরোপের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগের দল। আর সেই ধারাবাহিকতাই তারা ধরে রাখতে চায় বিশ্বকাপেও।
বেলজিয়ামের আক্রমণের বড় ভরসা জেরেমি ডোকু। বাছাইপর্বে পাঁচ গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করা ম্যানচেস্টার সিটি তারকা প্রস্তুতি ম্যাচেও ছিলেন দুর্দান্ত ছন্দে। তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ৫-০ গোলের জয়ে দুটি অ্যাসিস্ট করে নিজের গুরুত্ব আরও একবার প্রমাণ করেছেন তিনি। তার গতি, ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতা মিসরের রক্ষণভাগের জন্য হতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় রোমেলু লুকাকু। চোটের কারণে ২০২৫-২৬ মৌসুমের বড় একটি সময় মাঠের বাইরে কাটিয়েছেন এই স্ট্রাইকার। কোচ রুডি গার্সিয়া নিজেও তাকে পুরোপুরি ফিট নন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তারপরও জাতীয় দলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্য দেখানোর তাড়না থাকবে তার। একই সঙ্গে কেভিন ডি ব্রুইনে, থিবো কোর্তোয়াদের মতো সোনালি প্রজন্মের কয়েকজন তারকার জন্য এটি হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ। যা দলটিকে বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাবে।
অন্যদিকে মিসরও এসেছে স্বপ্ন আর প্রত্যাশা নিয়ে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সাতটি ম্যাচ খেলেও জয় পায়নি ‘ফারাও’রা। তাই এবার সেই আক্ষেপ ঘোচানোর লক্ষ্য নিয়েই উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে পা রেখেছে তারা। আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় প্রতীক মোহাম্মদ সালাহ। যার কাঁধেই থাকবে আক্রমণভাগের মূল দায়িত্ব।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মিসরের ৬০ শতাংশ গোলে সরাসরি অবদান ছিল সালাহর। ৯ গোলের সঙ্গে তিনটি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। আরও একটি বিশেষ কারণও রয়েছে এই ম্যাচকে ঘিরে, লড়াইয়ের দিনই ৩৪ বছরে পা দেবেন লিভারপুল তারকা। নিজের জন্মদিনে দেশের হয়ে বিশ্বকাপের প্রথম জয় উপহার দেওয়ার চেয়ে স্মরণীয় উপহার আর কী-ই বা হতে পারে! তার সঙ্গে আক্রমণে থাকবেন ওমর মারমুশ, যার গতি ও ক্ষিপ্রতা বেলজিয়ামের রক্ষণকে ব্যস্ত রাখার সামর্থ্য রাখে।
মিসরের কোচ হোসাম হাসান সম্ভবত রক্ষণভাগকে শক্ত রেখে পাল্টা আক্রমণভিত্তিক কৌশল বেছে নেবেন। প্রস্তুতি ম্যাচে রাশিয়াকে হারানোর পর ব্রাজিলের বিপক্ষে লড়াই করেও অল্প ব্যবধানে হেরেছে মিসর। ফলে আত্মবিশ্বাস নিয়েই তারা বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামবে। অন্যদিকে অনুশীলনে পাওয়া ছোটখাটো চোট কাটিয়ে জেরেমি ডোকুও প্রস্তুত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। গোলবারের নিচে থাকবেন অভিজ্ঞ থিবো কোর্তোয়া, যার জন্য এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপে ১৬তম ম্যাচ।
পরিসংখ্যানও এই ম্যাচে যোগ করেছে বাড়তি রোমাঞ্চ। বিশ্বকাপে এবারই প্রথম দেখা হলেও প্রীতি ম্যাচে চারবার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। সেখানে তিনবারই জয় পেয়েছে মিসর। সর্বশেষ ২০২২ সালের লড়াইয়েও তারা ২-১ গোলে হারিয়েছিল বেলজিয়ামকে। তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে আফ্রিকান প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে বেলজিয়ামের রেকর্ড বেশ ভালো, পাঁচ ম্যাচে মাত্র একবার হেরেছে তারা।
সবমিলিয়ে অভিজ্ঞতা, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং তারকাখচিত স্কোয়াডের বিচারে কিছুটা এগিয়ে থাকবে বেলজিয়াম। তবে সালাহর নেতৃত্বে আত্মবিশ্বাসী মিসরও যেকোনো সময় ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে। তাই গ্রুপ ‘জি’-এর এই লড়াইটি হতে পারে কৌশল, আবেগ আর তারকাদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ভরপুর এক দারুণ ফুটবল যুদ্ধ।
সম্ভাব্য একাদশ
বেলজিয়াম : থিবো কোর্তোয়া, টিমোথি কাস্তান, জেনো ডেবাস্ত, আর্থার থিয়াতে, ম্যাক্সিম ডে কুইপার, আমাদু ওনানা, ইউরি তিলেমান্স, কেভিন ডি ব্রুইনে, জেরেমি ডোকু, লিয়ান্দ্রো ত্রোসার, রোমেলু লুকাকু।
মিসর : মোহাম্মদ এল শেনাউই, মোহাম্মদ হানি, রামি রাবিয়া, মোহাম্মদ আবদেলমোনেম, আহমেদ ফাতুহ, হামদি ফাতহি, মারওয়ান আতিয়া, এমাম আশুর, মোহাম্মদ সালাহ, ওমর মারমুশ, মোস্তফা মোহাম্মদ।

স্পোর্টস ডেস্ক