বিশ্বকাপ ট্রফির সামনে দাঁড়িয়ে জাতীয় দলের স্বপ্ন ও বাস্তবতা
‘গ্রেটেস্টে শো অন দ্যা আর্থ’ খ্যাত ফুটবল বিশ্বকাপ আসলেই গাছে গাছে, বাসার ছাদের ওপরে পৎপৎ করে উড়তে থাকে প্রিয় দলের পতাকা। বাসার দেওয়ালে দেখা যায় আলপনার তুলিতে রাঙা প্রিয় খেলোয়ারের জাদুকরি মুহুর্ত। প্রিয় দল বিশ্বকাপের শিরোপা জিতলেই দেখা যায় উৎসব।
চলতি বছরের জুনে পর্দা উঠবে বিশ্বকাপের। তার আগে ভ্রমণে বেড়িয়েছে বিশ্বকাপের ট্রফি। বর্তমান গন্তব্য বাংলাদেশ। আপাতত সেই উদযাপনই চলছে লাল-সবুজের এই দেশে। অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো।
কেউ ট্রফির সঙ্গে সেলফি তুলবে। আবার কেউ হয়তো দূর হতে দাঁড়িয়ে দেখবে আর মনের কোণে এক চিলতে আক্ষেপ নিয়ে বলবে- ইশ! বাংলাদেশ যদি বিশ্বকাপে খেলতো। তবে স্বপ্ন দেখতে নেই বারণ। কারণ বর্তমানে দেশের ফুটবলের জোয়ার।
এসবের মাঝেই বাংলাদেশে একদিনের জন্য এসেছে ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফি। ফুটবল নিয়ে ভক্তদের যে উন্মাদনা, ফুটবলাররাও তার বাইরে নন। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াকেও ছুঁয়ে গেছে উন্মাদনা। আজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিশ্বকাপ ট্রফি এসেছে ঢাকায়। সেখানে উপস্থিত হন জামাল।
বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘ট্রফিটা দেখার পর জাস্ট এক্সট্রা মোটিভেশন আসছে। যেহেতু ট্রফি আসছে বাংলাদেশে। আশা করি, আমাদের ফুটবলার যারা কঠোর পরিশ্রম করতে পারে, এটা তাদের জন্য অনুপ্রেরণার হোক। আমি মনে করি, যারা ফুটবলার হতে চায়, তাদের জন্য এই ট্রফি আরও অনুপ্রেরণার হবে। এই ট্রফি…আমি মনে করি, নতুন প্রজন্ম বিশ্বকাপে একটা অধ্যায় লিখতে পারে।’
গত বছর থেকে বদলে গেছে দেশের ফুটবলের চিত্র। বাংলাদেশের ফুটবল প্রমীদের স্বপ্ন সারথী হয়ে এসেছেন হামজা চৌধুরী-শমিত সোম-ফাহমিদুল ইসলামরা। তাদের আগমনে দেশের ফুটবল নিয়ে বাংলার মানুষ নতুন করে স্বপ্ন বুনন করতে শুরু করেছে।
এক সময় যেখানে বিনে পয়সায় টিকিটে দিয়েও মানুষকে স্টেডিয়ামমুখী করা যেতো না, এখন সেখানে টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে গিয়েও টিকিট পাওয়া যায় না। ১০ মিনিট যেতে না যেতেই শেষ হয়ে যায় ১৮ হাজার টিকিট। বিভাগীয় শহরগুলোতে চলে জায়ান্ট স্ক্রিনে হাজারো দর্শকের ম্যাচ উপভোগ। হারিয়ে যেতে বসা ফুটবল এখন পুণর্জন্ম পেয়েছে। বাংলার ফুটবল প্রেমীরাও আশা দেখতে শুরু করেছে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার।
সেই আশার পালে আরেকটু হাওয়া দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। নতুন আঙ্গিকে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ। যেখানে বেড়েছে দলের সংখ্যা। প্রথমবারের মতো এবারের বিশ্বকাপ মাঠে গড়াবে ৪৮টি দল নিয়ে। এতে দল বেড়েছে এশিয়া অঞ্চল থেকে।
এই সুযোগ কাজে লাগানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াও। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘৪৮ দলের বিশ্বকাপ হওয়াতে এশিয়ার জন্য কোটা বেড়েছে। এটা আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য বড় সুযোগ। আমরা যদি ধাপে ধাপে এগোতে পারি এবং আমাদের ঘরোয়া ফুটবল আরও শক্তিশালী হয়, তবে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপে খেলা অসম্ভব নয়। আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।’
জামাল ভূঁইয়ার এই বক্তব্যে যেমন আশার কথা আছে, তেমনি ফুটে ওঠেছে বাস্তবতার প্রতিচ্ছবিও। হামজা-শমিতদের আগমনে মাঠের ফুটবলে জোয়ার লাগলেও ঘরোয়া ফুটবল এখনও যেন সেই অতল গহ্বরেই রয়ে গেছে।
ফুটবল ১১ জনের খেলা। রথি-মহারথি না হলে একা কখনো দলকে বিশ্ব মঞ্চে নিয়ে যাওয়া যায় না। যেমনটা যায়নি গত বছর। ডিফেন্ডস থেকে মিডফিল্ড, স্ট্রাইকারদের ব্যর্থতায় গোল করার দায়িত্ব নেওয়া—মাঠে হামজার উপস্থিতি ছিল এমনই। কিন্তু বাকিদের ভুলে এএফসি এশিয়ান কাপের মূলমঞ্চে ওঠার লড়াইয়ে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপ তো আরও দূরে।
বর্তমান বাংলাদেশ দলে প্রবাসী ফুটবলার আছেন চারজন, যারা বিদেশের লিগে খেলেন। বাকিরা খেলেন বাংলাদেশের ঘরোয়া লিগে। যেই লিগের মাঠ নিয়ে বহুল প্রচলিত একটি বাক্য হলো- ‘পাড়ার মাঠও এর চেয়ে ভালো’। তার বাস্তবতা অবশ্য দেখা যায় সরাসরি সম্প্রচারে। একপাশে মাঠ পরিষ্কার করেন কৃষকরা, অন্য পাশে খেলেন ফুটবলাররা। বল থ্রোয়িং করতে হয় বন পেরিয়ে এসে। এভাবেই চলছে ঘরোয়া লিগ।
তৃণমূল থেকে প্রতিভা বাছাইয়েও নেই কার্যকর উদ্যোগ। হারিয়ে গেছে পাইওনিয়ার লিগ। নেই জেলা কিংবা বিভাগীয় কোনো লিগ। ক্ষুদে প্রতিভা বাছাইয়েও কার্যকর কিংবা নিয়মিত কোনো প্রোগ্রাম চালু নেই। সিন্ডিকেটের কালো ধোঁয়ার গন্ধ তো আছেই।
এই যখন ঘরোয়া ফুটবলের অবস্থা, তখন দেশের ফুটবলপ্রেমীদের আশা—বুননের আগেই সুতো ছিড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এটি যেন দেশের ফুটবলের চরম বাস্তবতার গল্প। এই গল্প না বদলালে, বাংলাদেশের বিশ্ব মঞ্চের আশা কেবল মনের কোণে লুকিয়ে থাকা আক্ষেপ হয়েই থাকবে। আর বিশ্বকাপের ট্রফি দেখে কিংবা বিশ্বকাপ এলে আক্ষেপ নিয়ে বলতে হবে- ইশ! বাংলাদেশ যদি বিশ্বকাপে খেলত।

নাজমুল সাগর