শুধু টাকার জন্য ১২–১৫ ঘণ্টা সময় দিতে চাই না: শবনম ফারিয়া
একসময় অভিনয়কেই জীবনের মূল লক্ষ্য মনে করতেন অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া। নিয়মিত কাজ করাকেই ভাবতেন ক্যারিয়ারে সাফল্যের মাপকাঠি। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাঁর ভাবনা। এখন পরিবার, নিজের ঘর ও ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি পছন্দের কাজকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানান এই অভিনেত্রী।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে এক ফেসবুক পোস্টে নিজের ব্যক্তি জীবন, অভিনয়, প্রমোশনাল কনটেন্ট তৈরি এবং কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সীমারেখা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন শবনম ফারিয়া।
নিজের অভিনয়জীবনের শুরুর সময়ের কথা স্মরণ করে শবনম ফারিয়া লিখেছেন, ‘অনেকদিন পর্যন্ত আমার মনে হতো, আমার জীবনটা বোধহয় অভিনয়কে ঘিরেই হতে হবে। অভিনয় ভালোবেসেই শুরু করেছিলাম। একটা সময় মনে হতো, ক্যারিয়ার মানেই অভিনয়, আর নিয়মিত কাজ করাটাই হয়তো সফলতার মাপকাঠি।’
তবে জীবনের নানা অভিজ্ঞতার পর সেই ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে বলে জানান তিনি। ফারিয়ার ভাষায়, ‘অনেক বছর অনেক ধরনের সংগ্রামের পর আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমার সেই জীবনটা আছে, যেটা আমি সবসময় চেয়েছি একটা পরিবার, একটা নিজের ঘর, এমন একটা জায়গা, যেখানে দিন শেষে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। এই জীবনটা পাওয়ার পর বুঝেছি, আমার কাছে কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’
অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা এখনও আগের মতোই আছে জানিয়ে শবনম ফারিয়া বলেন, ‘আমি এখনও অভিনয় ভালোবাসি। এখনও অভিনয় করতে চাই। কিন্তু এমন কোনো স্ক্রিপ্টে শুধু টাকার জন্য ১২–১৫ ঘণ্টা সময় দিতে চাই না, যেটা আমি নিজেই পছন্দ করি না। তার সঙ্গে শুটিংয়ে যাওয়া-আসার ট্রাফিক জ্যাম তো আছেই! আমি বরং এমন একটা গল্প বা চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করতে চাই, যেটা সত্যিই আমাকে এক্সাইট করবে।’
এই কারণেই প্রমোশনাল কনটেন্ট তৈরি তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করে এই অভিনেত্রী বলেন, ‘প্রথমে রাকিন আমাকে এই আইডিয়াটা দেয়। শুরু করার পরপরই অনেক ব্র্যান্ড ও কোম্পানি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করে কেউ সরাসরি, কেউ এজেন্সির মাধ্যমে, আবার কেউ পরিচিত বা বন্ধুদের মাধ্যমে। গত এক বছরে অনেক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেছি।’
তবে সব ধরনের ব্র্যান্ডের প্রচারে যুক্ত হননি শবনম ফারিয়া। নিজের ব্যক্তিত্ব, জীবনযাপন ও বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্র্যান্ডই বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে জানান।
প্রমোশনাল কনটেন্ট তৈরির অন্যতম কারণ ভালো পারিশ্রমিক—এ কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি প্রমোশনাল কনটেন্ট করি কারণ এখানে ভালো পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। এটা বলতে আমার কোনো অস্বস্তি নেই। আমি যদি ২–৩ ঘণ্টা সময় দিয়ে, নিজের সুবিধামতো সময়ে কাজ করে ভালো পারিশ্রমিক পাই, আর একইসঙ্গে আমার পরিবার, আমার সংসার এবং নিজের জন্য সময় রাখতে পারি, তাহলে আমি কেন সেটা করব না?’
তবে পারিশ্রমিকের পাশাপাশি নিজের বিশ্বাস ও স্বাচ্ছন্দ্যকেও গুরুত্ব দেন তিনি। কোনো ব্র্যান্ডের সঙ্গে নিজের নাম ও পরিচয় যুক্ত করার আগে সেটির বিষয়ে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন কি না, সেটিও বিবেচনা করেন বলে জানান।
এ বিষয়ে শবনম ফারিয়া বলেন, ‘শুধু ভালো পারিশ্রমিক পেলেই আমি কোনো কাজ করতে চাই না। আমার মুখ, আমার নাম এবং আমার বিশ্বাসের সঙ্গে কোনো একটা ব্র্যান্ডের নাম জড়িয়ে যাচ্ছে, তাই সেটার ব্যাপারে আমি কমফোর্টেবল কি না, সেটাও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’
নিজের কিছু নির্দিষ্ট সীমারেখার কথাও স্পষ্ট করেছেন অভিনেত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো স্কিন হোয়াইটেনিং প্রোডাক্ট, অ্যাসথেটিক সার্ভিস বা প্রোসিডিউর কিংবা স্লিমিং টি, কফি, ড্রিংক বা মেডিসিন প্রমোট করি না। এগুলো নিয়ে আমার সিদ্ধান্তটা খুব ব্যক্তিগত।’
ত্বকের রং ও শারীরিক গঠন নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে অভিনেত্রী লিখেছেন, ‘আমার গায়ের রং আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। আমার নাক, আমার মুখের গঠন, আমার চিবুক, আমার শরীর সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। কোনটা আমার জন্য সুন্দর, কোনটা আমার সঙ্গে মানানসই, সৃষ্টিকর্তা আমাদের চেয়ে ভালো জানেন। তাই এমন কোনো ধারণা প্রচার করতে চাই না যে সুন্দর হতে হলে আমাকে আরও ফর্সা হতে হবে, আরও চিকন হতে হবে, অথবা আমার মুখের কোনো একটা অংশ বদলাতে হবে।’
স্লিমিং পণ্যের প্রচার না করার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন অভিনেত্রী। নিজের ওজন নিয়েও গত কয়েক বছর ধরে সংগ্রামের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে আমি নিজেই আমার ওজন নিয়ে সংগ্রাম করছি। আমি জানি ওজন কমানোর জার্নি কতটা কঠিন হতে পারে। কিন্তু আমি কখনো কোনো স্লিমিং টি, কফি বা ম্যাজিক্যাল ড্রিংকের ওপর বিশ্বাস করিনি।’
নিজের ক্ষেত্রে বিষয়টি হরমোনজনিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা হরমোনাল, তাই শর্টকাটের বদলে প্রপার ট্রিটমেন্টে বিশ্বাস করি স্পেশালিস্ট রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ, ডায়েটিশিয়ানের গাইডেন্স, ওয়ার্কআউট এবং লাইফস্টাইল চেঞ্জেস। সময় হয়তো একটু বেশি লাগবে। কিন্তু আমি এমন কোনো শর্টকাটের কথা অন্য কাউকে বলব না, যেটা আমি নিজেই বিশ্বাস করি না।’
নিজে যে পণ্য বা সেবা ব্যবহারে বিশ্বাস করেন না, তা শুধু অর্থের বিনিময়ে অন্যকে প্রচার করতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না বলে জানান তিনি। শবনম ফারিয়ার কথায়, ‘আমি নিজে যেটা ব্যবহার করতে বা করতে বিশ্বাস করি না, শুধু টাকা নিয়ে অন্য কাউকে সেটা করতে বলাটাও আমার কাছে ঠিক মনে হয় না। আর সত্যি বলতে, এই ক্যাটাগরির অনেক ব্র্যান্ডই নিয়মিত আমার কাছে আসে।’
দেশে ফর্সা হওয়ার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই অভিনেত্রী। তিনি লিখেছেন, ‘মাঝেমধ্যে সত্যিই ভাবি, আমাদের বাংলাদেশিদের মধ্যে ফর্সা হওয়ার এই অবসেশনটা কোথা থেকে এলো? এখন শুধু ফর্সা হলেই হচ্ছে না, নাক কেমন হবে, চিবুক কেমন হবে, শরীরের শেপ কেমন হবে, কতটা চিকন হতে হবে সৌন্দর্যের যেন একটা নির্দিষ্ট টেমপ্লেট তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।’
তবে নিজের যত্ন নেওয়া কিংবা নিজের চেহারায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করেন না শবনম ফারিয়া। তিনি এটিকে ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবেই দেখেন।
তাঁর আপত্তি অন্য জায়গায়—কোনো মানুষকে প্রতিনিয়ত এমন অনুভব করানো যে সৃষ্টিকর্তা যেভাবে তাকে সৃষ্টি করেছেন, সেটি যথেষ্ট সুন্দর নয়।
সবশেষে নিজের কাজের সীমারেখা প্রসঙ্গে ফারিয়া বলেন, ‘আমি এমন দাবি করছি না যে, আমি যেসব প্রোডাক্ট প্রমোট করি, সেগুলোর প্রতিটা পৃথিবীর সবচেয়ে পারফেক্ট প্রোডাক্ট হতে হবে। আমি শুধু এটুকু বলতে চাই, আমার কিছু সীমারেখা আছে। আলহামদুলিল্লাহ, আজ আমি এমন একটা জায়গায় আছি, যেখানে সেই সীমারেখাগুলো মেনে কাজ বেছে নেওয়ার সুযোগ আমার আছে। আমি সেই সুযোগটা সচেতনভাবেই ব্যবহার করতে চাই।’

বিনোদন ডেস্ক