বাজে মন্তব্যের শিকার বলিউড অভিনেত্রীরা
অনলাইনে ভোগান্তি এবং হয়রানি দিনকে দিন বেড়েই চলছে। বিশেষ করে সেলিব্রিটিদের প্রোফাইলে বাজে বা উদ্দেশ্যমূলক বা যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য করে কিছু কিছু মানুষ তাদের বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দিয়ে থাকে। এসব মন্তব্যের বেশির ভাগই করা হয় ফেক বা ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে।
বোনের সঙ্গে নিজের একটি ছবি ফেসবুক পেজে আপলোড করেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটার নাসির হোসাইন। সেখানে বেশ কয়েকজনের বাজে কমেন্টের কারণে পরে ছবিটি সরিয়ে নেন নাসির। এ নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেন তিনি। সে সময়ে বেশ আলোচিত হয় সোশ্যাল মিডিয়ায় হয়রানির বিষয়টি।
এরকম ঘটনা বাংলাদেশের বিভিন্ন মাধ্যমের জনপ্রিয় তারকাদের ক্ষেত্রে আরো ঘটেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও। বিশেষ করে অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে। তাদের উদ্দেশ্য করে নানারকম বাজে মন্তব্য করা হচ্ছে তাদের টুইটার এবং ফেসবুক অ্যাকাউন্টে। বিশেষ করে কোনো অভিনেত্রী যদি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অথবা সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে থাকেন তাহলে তাঁকে আরো ন্যক্কাজনকভাবে হেয় করা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে। সঙ্গে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মানহানিকর বিভিন্ন ট্রল। অর্থাৎ ওই অভিনেত্রীর ছবির সঙ্গে কোনো কমেন্ট জুড়ে তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ের এ রকম বেশ কয়েকটি ঘটনা এবং এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কোয়ার্টজ ডটকম।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বলিউড অভিনেতারাও এ ধরনের বাজে মন্তব্য বা মানহানিকর ট্রলের শিকার হয়েছেন। তবে তাঁদের ক্ষেত্রে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে তার মাত্রা ছিল আরো বেশি এবং আগ্রাসী। বিশেষ করে অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে অশ্লীল এবং শারীরিক বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা হয়েছে। যেটা থেকে রক্ষা পেয়েছেন অভিনেতারা।
এ ধরনের বিকৃত মানসিকতার উৎস কী? সে সম্পর্কে জানতে চাইলে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা কবিতা কৃষ্ণান কোয়ার্টজকে জানান, ‘মন্তব্যের ক্ষেত্রে সব সময়ই নির্ধারক হিসেবে কাজ করে লিঙ্গ। জনপ্রিয় তারকাদের হেয় করে ট্রল বানানো এবং তা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় বিকৃত আনন্দ পান কিছু মানুষ। তাঁরা এটা নির্দ্বিধায় করেন কারণ তাঁরা জানেন তাঁদের সত্যিকার পরিচয় কেউ উদ্ধার করতে পারবে না। আর সে কারণেই তাঁরা যা খুশি তাই মন্তব্য করে বসেন।’
সম্প্রতি মুম্বাইতে চারদিনের জন্য মাংস বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে তা নিয়ে টুইটারে প্রতিক্রিয়া জানান অভিনেত্রী সোনম কাপুর ও সোনাক্ষী সিনহা।
মাংস বিক্রি বন্ধের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোনম কাপুর তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টে লেখেন, ‘কিছু সংকীর্ণমনা এবং নারীবিদ্বেষী মানুষের জন্য আমাদের দেশ সব সময়ই তৃতীয় বিশ্বের দেশই রয়ে যাবে।’
এরপরই তাঁর টুইটারে বিপরীতে পাল্টা টুইট করা শুরু হয় বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে। যেসব টুইটে মাংস বিক্রির নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বাদ দিয়ে সোনম কাপুরের ব্যক্তিগত জীবন, ক্যারিয়ার এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা শুরু হয়।
বলিউড অভিনেত্রীদের ‘মেয়েছেলে’ আখ্যা দিয়ে তাদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মন্তব্য করেন বেশ কয়েকজন। অনেকেই মন্তব্য করেন যে, রাজনৈতিক বিষয়ে মন্তব্য করে বলিউড অভিনেত্রীরা আলোচনায় আসতে চান।
মাংস বিক্রির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান আরেক অভিনেত্রী সোনাক্ষী সিনহা। তিনি তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টে লেখেন, ‘এটা একটা মুক্ত দেশ। ব্যান-ইস্তানে স্বাগতম। মানে আমি লিখতে চেয়েছিলাম ভারত, অটোকারেক্টের বোকামি।’
মাংস বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়ায় ভারতকে ‘ব্যান-ইস্তান’ বলায় অনেকেই নাখোশ হন সোনাক্ষীর ওপর। নারী-পুরুষ অনেকেই সোনাক্ষীর শারীরিকক গঠন নিয়ে বাজে মন্তব্য করেন। উরজা পাটেল সোধা নামে এক নারী রিটুইটে লেখেন, ‘মাংস বিক্রি বন্ধ হওয়ায় সোনাক্ষী আর মোটা হতে পারবে না, তাই তাঁর এত ক্ষোভ।’ আরেকজন সোনাক্ষীকে ‘গাধা’ এবং ‘জাম্বো’ বলে মন্তব্য করেন।
এ বছরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি ক্যাম্পেইন চালু করেন ‘সেলফি উইথ ডটার’ নামে। যেখানে বাবারা তাঁদের মেয়েদের সঙ্গে সেলফি তুলে আপলোড করেন ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলোতে।
এই কর্মসূচির সমালোচনা করে অভিনেত্রী শ্রুতি শেঠ তাঁর টুইটারে লেখেন, ‘সেলফি দিয়ে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না, পরিবর্তন আনতে হলে প্রধানমন্ত্রীকে পুনর্গঠনের কাজে হাত দিতে হবে। কারণ ভারতের এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে মানুষের হাতে সেলফি তোলার মতো মোবাইল ফোন নেই।’
শ্রুতির এই মন্তব্যের বিরোধিতা করেন বিজেপি এবং মোদি সমর্থকরা। তাঁরা টুইটারে শ্রুতিকে নিয়ে অশ্লীল এবং বাজে কমেন্ট করেন। অনেকেই শ্রুতিকে ‘আম আদমি পার্টির কর্মী’, ‘পতিতা’ এবং ‘শয়তানি’ বলে আখ্যা দেন।
এ ধরনের মন্তব্যের দুদিন পর শ্রুতি তাঁর প্রতিক্রিয়া জানাতে টুইটারে একটি নোট লেখেন। সেখানে তিনি লেখেন, “বিভিন্নভাবে টুইটারে আমাকে এবং আমার পরিবারকে হেয় করা হয়েছে। আমার মুসলিম স্বামী এবং ১১ মাসের মেয়েকে নিয়েও নানা রকমের বাজে মন্তব্য করা হয়েছে। এমনকি বলিউডে আমার ‘ব্যর্থ ক্যারিয়ার’ নিয়েও মন্তব্য করা হয়েছে। কিন্তু যাঁরা মন্তব্য করেছেন, তাঁরা ভুলেই গেছেন একজন অভিনেত্রী হওয়ার পাশাপাশি আমি কারো মেয়ে, বোন, স্ত্রী, মা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন নারী। যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর ক্যাম্পেইনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে নিজেদের মেয়ের সঙ্গে সেলফি তুলেছেন, তাঁরা মনে হয় আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়েছেন আমার মন্তব্যে। এমনকি আমার পিতৃপরিচয় বা ছোটবেলায় বাবার কাছ থেকে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছি কি না সেগুলোও জানতে চেয়েছেন। নারীরাও আমার মন্তব্যের বিরুদ্ধাচরণ করতে ছাড়েননি। তাঁরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে আমি খুচরা জনপ্রিয়তা পেতে চেয়েছি, কারণ এখন আমাকে কেউ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ডাকে না। তাদের ছেলেরা বড় হয়ে অন্য মেয়েদের কোন দৃষ্টিতে দেখবে সেটা আমি দিব্যি বুঝতে পারছি।”
এতে গেল অভিনেত্রীদের নিজেদের মন্তব্যের কারণে হয়রানির ঘটনা। কিছু না করেও বাজে মন্তব্য এবং ট্রলের শিকার হয়েছেন আরেক বলিউড অভিনেত্রী আনুশকা শর্মা। ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের টেস্ট অধিনায়ক বিরাট কোহলির সঙ্গে প্রেম করছেন আনুশকা। গত ক্রিকেট বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বিরাটের বাজে পারফরম্যান্সের জন্য আনুশকাকে দায়ী করে ট্রল ছাড়া হয় বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে। এমনকি আনুশকার বলিউড ক্যারিয়ার বা যৌন জীবন নিয়েও বাজে ট্রল তৈরি করে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
মনোবিশেষজ্ঞ এবং সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের আচরণ সার্বিকভাবে ভারতে নারীদের অবমূল্যায়নের প্রতীক।
রেডিফ ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী শ্রুতি শেঠ বলেন, ‘আসলে মানুষের মনোভাব হচ্ছে, তুমি মেয়েমানুষ, রাজনীতির কী বোঝো তুমি? যেটা তোমাকে মানায় তুমি সেটাই করো, রান্নাবান্না করো, স্বামী-সন্তানের সেবা করো। রাজনীতি নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। আর এই মানসিকতার কারণেই অভিনেত্রীদের মন্তব্যের এ রকম পাল্টা মন্তব্য আসে।’
শ্রুতি আরো বলেন, ‘আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করা হয়েছে কারণ আমি তাদের বাজে মন্তব্যের জবাব দিয়েছিলাম। কারণ আপনি যদি চুপচাপ বসে থাকেন কিছুই বদলাবে না। যতই আপনাকে হেয় করুক আপনাকে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে।’
নারী অধিকারকর্মী কবিতা কৃষ্ণান বলেন, ‘এ ধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে মন্তব্যকারীরা আরো উৎসাহ পায়। এদের চিহ্নিত করে বাজে মন্তব্যের কারণে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং তাদের অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’

ফাহিম ইবনে সারওয়ার