এনটিভিতে সংবাদ প্রকাশের পর সেই শিশুর পাশে জেলা প্রশাসক
রাজবাড়ীতে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় সিজারিয়ান অপারেশনের পর সোমা আক্তার (২৫) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনায় দেশের ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি টেলিভিশন ‘এনটিভি’তে সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর তৎপর হয়েছে জেলা প্রশাসন। খবর প্রকাশের পরপরই মাতৃহারা দুই দিনের অসহায় নবজাতক শিশু ও শোকার্ত পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) আফরোজা পারভীন স্বশরীরে নিহত সোমার স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে যান এবং পিতৃহারা-মাতৃহারা শিশুটিকে কোলে তুলে নেন। এ সময় নবজাতকের জন্য নতুন জামাকাপড়, উপহার ও প্রয়োজনীয় ডায়াপার পৌঁছে দেন জেলা প্রশাসক। সফরের সময় রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফয়জুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনের সময় জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, এনটিভিতে খবরটি প্রচারের পর পুরো বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। এ ঘটনার পেছনে কোনো চিকিৎসাগত অবহেলা ছিল কি না, তা নিখুঁতভাবে বের করতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্তের সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে দায়ী ক্লিনিক ও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে। রোববার সকালেই মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিনিধিদল রাজবাড়ীতে পৌঁছে পুরো ঘটনার সরেজমিন তদন্ত কার্যক্রম শুরু করবেন।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাচুরিয়া ইউনিয়নের কোনাইল গ্রামের রবিউল ইসলামের স্ত্রী সোমা আক্তার গত ২২ সেপ্টেম্বর সন্তান প্রসবের উদ্দেশ্যে রাজবাড়ী শহরের আরোগ্য ক্লিনিকে ভর্তি হন। সেখানে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. এস এম হান্নান তার সিজারিয়ান অপারেশন পরিচালনা করেন। তবে অপারেশনের পরপরই সোমার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে তড়িঘড়ি করে তাকে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের পরিবারের সুস্পষ্ট অভিযোগ, চিকিৎসকের চরম অবহেলা ও অনভিজ্ঞতার কারণেই সোমার অকাল মৃত্যু ঘটেছে। তবে আরোগ্য ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রসূতির হার্টের ভালভে আগে থেকেই জটিলতা ছিল এবং তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুরে পাঠানো হলে সেখানেই তিনি মারা যান।
নিহতের বড় বোন রাজিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, অপারেশনের আগে ডাক্তার আমাদের কোনো ধরনের শারীরিক সমস্যার কথা জানাননি। অপারেশনের পর সোমার অবস্থার অবনতি হলে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেয়। তোলার সময় আমরা দেখি সোমার জিহ্বা কামড় দেওয়া অবস্থায় নিশ্চল হয়ে আছে। ফরিদপুর পৌঁছানোর পরপরই ডাক্তার সোমাকে মৃত ঘোষণা করেন। আমাদের ধারণা, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ মৃত্যু আড়াল করতেই রাজবাড়ী থেকে ওকে মৃত অবস্থায় ফরিদপুর পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে সিজারিয়ান অপারেশনকারী চিকিৎসক ডা. এস এম হান্নানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তার ব্যক্তিগত চেম্বারে গিয়ে বক্তব্য চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
জন্মের পর মায়ের স্পর্শ ও আদর বুঝে ওঠার আগেই মাত্র দুই দিনের শিশুটি হারিয়েছে তার জন্মদাত্রীকে। তবে এনটিভিতে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ যেভাবে ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাতে বিচার পাওয়া ও শিশুটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা আশার মুখ দেখছেন স্বজনেরা।

মো. কবির হোসেন, রাজবাড়ী