ইতালির লোভে লিবিয়ায় সাইদুল, ৩৯ লাখ টাকা হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার
ইউরোপ মহাদেশের ইতালিতে গিয়ে পরিবারের অভাব-অনটন দূর করার স্বপ্ন ছিল মাদারীপুরের সাইদুল বেপারীর (৩২)। তবে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে সেই স্বপ্ন এখন এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। ইতালিতে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শ্রীলঙ্কা ও দুবাই ঘুরিয়ে সাইদুলকে পাচার করা হয় গৃহযুদ্ধকবলিত লিবিয়ায়। সেখানে তাকে অজ্ঞাত স্থানে জিম্মি রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে ধাপে ধাপে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ৩৯ লাখ টাকা।
সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পথে বসেছে। গত দুই মাস ধরে সাইদুলের সঙ্গে পরিবারের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তার জীবন নিয়ে চরম শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন স্বজনেরা। ঘরের চৌকাঠে চোখ রেখে অঝোর ধারায় কাঁদছেন বৃদ্ধা মা সূর্যবান বেগম। অন্যদিকে, বাবার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে চার বছরের শিশুসন্তান ও ১১ মাসের অবুঝ কোলে শিশু। অবুঝ চার বছরের মেয়েটি আজও বাবাকে দেখতে মায়ের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে কেঁদে ওঠে—সে জানেই না তার বাবা কোথায়, কেমন অবস্থায় আছে!
নিখোঁজ সাইদুলের পরিবারের দেওয়া অভিযোগসূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটকচর এলাকার চিহ্নিত মানব পাচারকারী দালাল আনোয়ার ফরাজী ওরফে আনু ২৩ লাখ টাকার মৌখিক চুক্তিতে ২০২৫ সালের মে মাসে ১২ লাখ টাকা অগ্রিম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে সাইদুলকে নিরাপদ রুটে ইতালি না পাঠিয়ে শ্রীলঙ্কা ও দুবাই ঘুরিয়ে লিবিয়ার মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে গোপন আস্তানায় হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের ভিডিও দেশে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে আরও ২৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে চক্রটি।
ভিটেমাটি বিক্রি, চড়া সুদে ঋণ এবং স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে মোট ৩৯ লাখ টাকা পরিশোধ করার পরও সাইদুলকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। গত দুই মাস ধরে সাইদুলের কোনো খবর না পেয়ে বাধ্য হয়ে তার বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে অভিযুক্ত দালাল আনোয়ারসহ সাতজনকে আসামি করে মাদারীপুর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন।
এদিকে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টিতে অভিযুক্ত দালাল আনোয়ার ফরাজী প্রথমে পুরোপুরি অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে তার স্ত্রী শিল্পী আক্তার স্বীকার করেন যে তারা বিভিন্ন দফায় ১৯ লাখ টাকা গ্রহণ করেছিলেন।
ঘটনার আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানান, আদালতের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা ও নথিপত্র পেলেই মামলাটি নিয়মিত থানা এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে এবং জড়ো হওয়া আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।
ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব পরিবারটির এখন একটাই আকুতি—সাইদুলকে যেন সরকার জীবিত উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনে এবং এই অবৈধ পাচারকারী চক্রের মূল হোতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সুনিশ্চিত করে।

এম. আর. মুর্তজা, মাদারীপুর