যমুনার ভাঙনে নদীগর্ভে ৩০-৪০ ঘর, ঝুঁকিতে ৪৫ বছরের পুরোনো মাদ্রাসা
যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে আবারও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ। উপজেলার বাঘুটিয়া, বাচামারা, জিয়নপুর ও চরকাটারী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েকদিনের ব্যবধানে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বসতঘর। তীব্র এই ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও প্রায় ১৫০টি বাড়িঘর। এছাড়া সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত চরকালিকাপুর শুকুরিয়া দাখিল মাদ্রাসা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষার পানি বৃদ্ধি এবং যমুনার তীব্র স্রোতের কারণে প্রতিদিনই ভাঙনের বিস্তার ঘটছে। নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের শেষ সম্বল বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও জীবিকার অবলম্বন। চরম ভাঙন আতঙ্কে অনেক পরিবার ইতিমধ্যেই নিরাপদ স্থানে তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আকলিমা আক্তার জানান, প্রতিদিনই নদী কিছুটা করে সামনে এগিয়ে আসছে, যার কারণে দিন-রাত চরম আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। কখন নিজের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়, সেই শঙ্কায় অনেকেই এখন রাত জেগে নদীপাড় পাহারা দিচ্ছেন।
স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী শারাফাত উল্লাহ জানান, সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে চরকালিকাপুর শুকুরিয়া দাখিল মাদ্রাসাকে ঘিরে। প্রায় ৪৫ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি একসময় নদী থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকলেও ধারাবাহিক ভাঙনে এখন যমুনা নদী এসে পৌঁছেছে ভবনের একেবারে সামনে। ইতোমধ্যে চারতলা একাডেমিক ভবনের সামনের অংশের মাটি ধসে পড়েছে এবং সীমানা প্রাচীরের একটি বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় পুরো চারতলা ভবনটিই নদীতে তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি যমুনা নদীতে অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের ফলেই ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। ইতোমধ্যে বাচামারা, বাঘুটিয়া ও চরকাটারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং চরকাটারী ইউনিয়নের বড় একটি অংশ এখন কার্যত মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। অতীতেও একইভাবে সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও বর্ষার প্রবল স্রোতে সেগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ফলে প্রতিবছরই একই দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে নদীপাড়ের মানুষকে। তাই অস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নয়, দ্রুত একটি স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানান তারা।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় দৌলতপুর উপজেলা প্রশাসন ও মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড কয়েক দফা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে। ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে ১৮ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে নদীতীরে তা ফেলার কাজও শুরু হয়েছে।
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, নদীতীরের মাটি বালুময় হওয়ায় ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কঠিন। আপাতত জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। এই স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভাঙন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিয়ান নূরেন বলেন, ভাঙন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ