মেয়েকে হত্যা করে বস্তাবন্দি লাশ সড়কে, আদালতে যা বললেন মা
খুলনা সরকারি ইকবাল নগর গার্লস হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বিবরণ ও দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন তার মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা। নিজের একমাত্র সন্তানকে পিটিয়ে হত্যার পর মরদেহ বস্তায় ভরে মোটরসাইকেলে নিয়ে গুম করার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে এই জবানবন্দিতে। এদিকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সেই মোটরসাইকেলটি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
আজ রোববার (১২ জুলাই) দুপুর ১২টার দিকে খুলনা নগরীর গল্লামারী কমিউনিটি সেন্টার ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের সামনে নির্জনার হত্যাকারী মা-বাবার ফাঁসির দাবিতে বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে এলাকাবাসী। সাবেক কমিশনার মাহমুদ আলম বাবুর সভাপতিত্বে মানববন্ধনে প্রধান অতিথি ছিলেন শেখ জামাল উদ্দিন।
গত শুক্রবার (১০ জুলাই) মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত-১ এর ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম খলিল মাহিমের কাছে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মা আরিফা ইয়াসমিন সীমা বলেন, নির্জনা উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন ও টিকটক করত। সে ইতোপূর্বে দুইবার বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। প্রথমবার বিয়ে করে চলে গেলেও পরে জানতে পারে সেই ছেলের আগের বউ আছে, ফলে সে ফিরে আসে। সর্বশেষ গত ১৭ এপ্রিল পরিবারের অমতে তেরখাদা উপজেলার আজগড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান রনি নামের এক কবিরাজকে বিয়ে করে। ১৫ দিন সংসার করার পর রনিরও আগের বউ থাকার কথা জেনে নির্জনা বাড়িতে ফিরে আসে।
বাড়ি ফিরলেও নির্জনা গোপনে রনির সাথে যোগাযোগ রাখত। এ নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে শাসন ও বকাঝকা করা হতো। গত ৮ জুলাই (বুধবার) বিকেলে নির্জনা কথা না শোনায় মা তাকে চড়-থাপ্পড় মারেন। মেয়ে চিৎকার শুরু করলে মা তার মুখ চেপে ধরেন। এই সময় বাবা আকাশ একটি লাঠি দিয়ে নির্জনাকে আঘাত করতে গেলে সেটি সরাসরি তার মাথায় লাগে। তখন মায়ের হাতের চাপে মুখ বন্ধ থাকা অবস্থায়ই মেয়েটি নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এরপর আইনি চোখ ফাঁকি দিতে প্রথমে একটি লুঙ্গি ও পরে প্লাস্টিকের বস্তায় মরদেহ ভরে মোটরসাইকেলের পেছনে বেঁধে শহরতলির প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার নিরিবিলি স্থানে ফেলে আসা হয়। জবানবন্দি শেষে আদালত আসামিকে জেলা কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
মানববন্ধনে বক্তা ও স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান, মেয়ের পছন্দের ছেলের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় নির্জনার বাবা-মা এই বিয়ে মেনে নেননি। জামাইকে কখনও বাড়িতে আসতে দেওয়া হতো না। বুধবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে বাবার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্বামীর কাছে চলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় নির্জনা। কিন্তু রাস্তা থেকে পাষাণ বাবা তাকে ধরে এনে সারাদিন নির্মম নির্যাতন চালায়। প্রতিবেশীরা জানান, নির্জনার ওপর প্রায়ই নির্যাতন চলত এবং মারধরের চিৎকার ঢাকতে ঘরে উচ্চস্বরে গান বাজানো হতো।
বসুপাড়া মেইন রোডের ‘নির্জনা নীড়’ নামক ওই বাড়ির প্রতিবেশী ষাটোর্ধ্ব আসমা বেগম বলেন, বুধবার সকালে মেয়েটি বাড়ি থেকে পালালে তাকে ধরে এনে পেটানো হয়। মাগরিবের আজানের ঠিক আগে নির্জনার শেষ আর্তনাদ শোনা গিয়েছিল- ‘বাবা, তুমি আমাকে আর মেরো না।’ এরপর সব শান্ত হয়ে যায়। রাত ৮টার দিকে প্লাস্টিকের বস্তায় ভারি কিছু একটা মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে বের হয় আকাশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক প্রতিবেশী বলেন, ঘাতক বাবা আকাশ একজন মাদকাসক্ত ও মাদক কারবারি, যার কারণে প্রায়ই তাদের বাড়িতে পুলিশ আসত। বৃহস্পতিবার সকালে ফেসবুকে নির্জনার মরদেহের ছবি দেখার পর কোনো অনুশোচনা ছাড়াই স্বামী-স্ত্রী দুজনে রিকশা নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ মাকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও ঘাতক বাবা এখনও পলাতক।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ গুমের কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়েছে। নম্বর প্লেটের সূত্র ধরে বিআরটিএ-তে এর প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়ের কাজ চলছে। এ ছাড়া মামলার প্রধান আসামি ও নির্জনার ঘাতক বাবা আকাশকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে।
এর আগে শুক্রবার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে নির্জনার মরদেহ তার দাদা ও চাচার কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে শনিবার বাদ ফজর নামাজে জানাজা শেষে নিরালা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

মুহাম্মদ আবু তৈয়ব, খুলনা