উন্নয়নশীল দেশের জন্য ১১২ বিলিয়ন ডলারের মূলধন সংগ্রহ বিশ্বব্যাংকের
বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ২০২৬ অর্থবছরে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ পরিমাণ বেসরকারি মূলধন সংগ্রহ করেছে। একই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দিয়েছে সংস্থাটি। এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের নিজস্ব অর্থায়ন ও দক্ষতার পাশাপাশি আরও বেশি বেসরকারি মূলধন কাজে লাগানোর লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের হিসাবে, গত চার বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সংগৃহীত বেসরকারি মূলধনের পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২২ অর্থবছরে ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নসহ ২০২৬ অর্থবছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোট অর্থায়ন ও সংগৃহীত মূলধনের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে।
বেসরকারি মূলধন সংগ্রহের এ প্রবৃদ্ধি বিভিন্ন আয়স্তরের দেশেই দেখা গেছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ২০২২ অর্থবছরের ১৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে হয়েছে ৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় তিন গুণ। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা চার গুণেরও বেশি। বেসরকারি মূলধন আকর্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি মূলধন বজায় ছিল।
আফ্রিকায়ও বেসরকারি মূলধন সংগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২২ অর্থবছরে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ২২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ১৫০ শতাংশ বেশি।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপ জানিয়েছে, বেসরকারি খাতের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে গত তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাজের গতি বাড়ানো ও প্রক্রিয়া সহজ করা, প্রতিষ্ঠানের সরকারি ও বেসরকারি অংশকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থায়নের বিভিন্ন সুযোগ সম্প্রসারণ।
প্রতিটি দেশে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সরকারি ও বেসরকারি খাতের কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত করা হয়েছে এবং উভয় ধরনের কার্যক্রমের জন্য একটি একক যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রয়োজন ও উন্নয়ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমন্বিত কৌশল প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগের পথে থাকা বাস্তব প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করতে এবং তা দূর করার কর্মপরিকল্পনা তৈরিতে প্রাইভেট সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট ল্যাবও এ উদ্যোগে সহায়তা করেছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ব্যবসা ও নিয়ন্ত্রক পরিবেশ উন্নত করা, গ্যারান্টি ও স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন বাড়ানো, বৈদেশিক মুদ্রা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, ইকুইটি অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বড় পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করার নতুন উপায় নিয়ে কাজ করছে।
এদিকে, ২০২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি গ্যারান্টি দিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার গ্যারান্টি দেওয়ার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা নির্ধারিত সময়ের চার বছর আগেই ছাড়িয়ে গেছে।
এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ গ্যারান্টি প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালে চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীরা বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গ্যারান্টি পণ্য সহজে একটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেন, ‘তিন বছর আগে আমাদের অংশীদার ও গ্রাহকেরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন—বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অর্থায়ন ও জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আরও বেশি বেসরকারি মূলধন সংগ্রহ করতে হবে এবং বেসরকারি খাতের জন্য আরও কার্যকর অংশীদার হতে হবে। সে লক্ষ্যেই আমরা কাজের পদ্ধতি বদলেছি-দ্রুত, সহজ ও একটি বিশ্বব্যাংক গ্রুপ হিসেবে সমন্বিতভাবে কাজ করছি।’
অজয় বাঙ্গা বলেন, ‘এর ফল হলো এ বছর ১১২ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি মূলধন সংগ্রহ, যা চার বছর আগে শুরু করা অবস্থানের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। তবে এই অর্থের পরিমাণ তখনই গুরুত্বপূর্ণ, যখন তা এমন জায়গায় যাবে যেখানে নতুন সুযোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সামনে আমাদের কাজ হলো বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা আরও দূর করা, বিনিয়োগকারীর পরিধি বাড়ানো এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে আরও বেশি মূলধন প্রবাহ নিশ্চিত করা।’
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সংস্থাটির হিসাবে, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছাবে। বিপরীতে এ সময়ে প্রায় ৪২ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এসব দেশে প্রতি ১০টি কর্মসংস্থানের মধ্যে ৯টিই বেসরকারি খাত সৃষ্টি করে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের কর্মসংস্থান কৌশলের তিনটি প্রধান ভিত্তি হলো—মানবসম্পদ ও ভৌত অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, ব্যবসার উপযোগী নিয়ন্ত্রক পরিবেশ তৈরি এবং বেসরকারি খাতকে ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করা।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অবকাঠামো ও জ্বালানি, কৃষি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন—এই পাঁচটি খাতকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব খাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বড় পরিসরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব বলে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ মনে করে।
২০২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের নিজস্ব অর্থায়ন ও সংগৃহীত মূলধনের ৫৫ শতাংশ এসব কর্মসংস্থাননির্ভর খাতে গেছে। এর ফলে শক্তিশালী অবকাঠামো ও উন্নত নীতিগত পরিবেশকে বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপ জানিয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগ শুধু তুলনামূলকভাবে সহজে বিনিয়োগ করা যায়—এমন বাজারে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতেও বিনিয়োগ পৌঁছাচ্ছে। এসব দেশে বৈশ্বিক মূলধনের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও ব্যবসায় অর্থায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্রমবর্ধমান ভূমিকা রাখছেন।
আরও বেশি বিনিয়োগকারীকে উন্নয়নশীল দেশের বিনিয়োগে সম্পৃক্ত করতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ এখন ‘অরিজিনেট-টু-ডিস্ট্রিবিউট’ (ও টু ডি) কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর কাছে আরও বড় পরিসরে পৌঁছে দেওয়ার উপায় তৈরি করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন উৎসে থাকা দীর্ঘমেয়াদি মূলধনকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিনিয়োগের সুযোগের সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করা।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন উৎস থেকে আরও বেশি মূলধন সংগ্রহ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সুযোগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তা কাজে লাগানো।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)