হরমুজ প্রণালি নিয়ে বৈঠক স্থগিত, মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগে ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা ফের অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুই জ্বালানি পরিবহন পথের আশপাশে নতুন করে হামলা হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন শুরুর পর তেলের দাম বেড়ে যায়। এর পেছনে অন্যতম কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ থাকা। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনটি পুরো সপ্তাহান্তে বন্ধ ছিল। খবর রয়টার্সের।
কূটনৈতিক অগ্রগতির আশা আরও ফিকে হয়ে যায় রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আল-বুসাইদি জানান, সোমবারের জন্য নির্ধারিত আঞ্চলিক বৈঠকটি ‘সমঝোতার স্বার্থে’ স্থগিত করা হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ওই বৈঠকে তারা অংশ নেবেন এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ওমানের সঙ্গে করা একটি চুক্তি উপস্থাপন করবেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্সের বরাত দিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের অনুরোধে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত তেহরান ও মাসকট যৌথভাবে নিয়েছে। বৈঠকের নতুন তারিখ নির্ধারণে ইরান ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করবে বলেও জানান তিনি।
সৌদি আরব আপাতত তাদের ওই পাইপলাইন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই বৈঠক স্থগিতের ঘটনা ঘটল। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের প্রধান বিকল্প পথ হিসেবে এতদিন পাইপলাইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিও অব্যাহত রয়েছে।
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, রোববার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং পরে ক্রুদের সরিয়ে নিতে হয়।
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, দেশটির উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় একজন নিহত এবং চারজন ক্রু আহত হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি বাজারেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা জুলাইয়ের পর প্রথমবার।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ডিজেলের খুচরা দামও রোববার নতুন রেকর্ড গড়ে। প্রতি গ্যালনের দাম ৬.২০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
রয়টার্সকে সৌদি তেল ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনটি বন্ধ থাকলে লোহিত সাগরের বন্দর ইয়ানবুতে মজুত তেল দিয়ে সৌদি আরব মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারবে।
এরপর বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে ইতোমধ্যে হারানো প্রতিদিনের কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহও যুক্ত হবে।
পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সৌদি আরব এখনও প্রকাশ করেনি। কতদিন এটি বন্ধ থাকবে, সেটিও জানানো হয়নি। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিভিন্ন সূত্র মেরামতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন সময়ের কথা জানিয়েছে। স্যাটেলাইট ছবিতে পাইপলাইনের বিভিন্ন স্থানে বড় ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে।
গত ছয় মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সহিংসতা আবার বেড়েছে। এর আগে আগস্টে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহও ধীরে ধীরে বাড়ছিল।
লন্ডনভিত্তিক প্যান-আরব সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ওমানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবিগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালি খুলবে না।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলার সক্ষমতা ঠেকানো এবং ইরানের জনগণের জন্য তাদের শাসকদের উৎখাতের পরিস্থিতি তৈরি করা—ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত সেগুলো অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়ারল্যান্ড সফরের সময় আইরিশ ওপেন গলফ টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া ট্রাম্প আবারও বলেন, চলতি বছরই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন। এমনকি নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই তা হতে পারে বলেও জানান তিনি। যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম ‘পাথরের মতো দ্রুত’ পড়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের নতুন সীমান্তপারের হামলার পর বাড়িঘর ও একটি মসজিদের ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও প্রকাশ করেছে সৌদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
হুথিরা পৃথকভাবে দাবি করেছে, তারা প্রতিবেশী একটি প্রদেশে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে। এর আগে তারা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ নিয়ন্ত্রণকারী বাব আল-মান্দেব প্রণালির ‘গেট অব টিয়ার্স’ হিসেবে পরিচিত পেরিম দ্বীপ দখল করেছে বলে দাবি করে।
লোহিত সাগরের উপকূল ধরে হুতিদের এই অগ্রযাত্রা কয়েক বছরের মধ্যে ইয়েমেনে সবচেয়ে বড় ধরনের সংঘাতের বিস্তার ঘটিয়েছে।
হুথিদের অগ্রযাত্রা ও সৌদি আরবের ওপর তাদের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। একদিকে ওয়াশিংটন সৌদি মিত্রদের সমর্থন ও জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখতে চায়, অন্যদিকে আরেকটি যুদ্ধের ফ্রন্টে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে চাইছে না।
হুথিদের হামলার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনেও কঠিন সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েছে—ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নেওয়া, নাকি ইরানের সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়া।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র দুই মাস ধরে হুথিদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছিল। তবে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলার হুমকি প্রত্যাহার করেছে—হুথিদের এমন ঘোষণার পর ট্রাম্প ওই অভিযান বন্ধ করে দেন।
রয়টার্সকে তিনটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের কার্যত শাসক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ফোন করে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে আপাতত ওয়াশিংটন শুধু গোয়েন্দা সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
শনিবার ট্রাম্পও স্বীকার করেন যে তিনি সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানান, হুথিরাও মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইয়েমেনের যুদ্ধে ওয়াশিংটনকে দূরে থাকার অনুরোধ করেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক