রুশ হামলা থেকে অল্পের জন্য বাঁচলেন বরিস জনসন
ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে রুশ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার কিছুক্ষণ আগেই একই রেলপথ দিয়ে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং ইউরোপের কয়েকজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা একটি ভিন্ন ট্রেনে ওই এলাকা অতিক্রম করেন।
স্থানীয় সময় রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ইয়াহোদিন এলাকায় চালানো ওই হামলায় ট্রেনটির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্রেনের সব যাত্রীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। খবর বিবিসির।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে কোম্পানি উক্রজালিজনিতসিয়ার দাবি, রুশ ড্রোনটি যে ট্রেনে আঘাত করেছে, সেটি ‘কূটনৈতিক ট্রেন’ও লক্ষ্য করে হয়ে থাকতে পারে।
রাশিয়া জানিয়েছে, তারা পশ্চিম ইউক্রেনের ‘রেলওয়ে অবকাঠামোতে’ হামলা চালিয়েছে।
উক্রজালিজনিতসিয়া জানিয়েছে, রুশ হামলার আশঙ্কায় সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সেই কারণে আক্রান্ত ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের আগেই স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার জেটচালিত ড্রোন হামলার মাত্র ১৫ মিনিট আগে ট্রেনটির যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইউক্রেন ও পোল্যান্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলাটি পোল্যান্ড সীমান্ত থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে হয়েছে।
হামলার সময় ইয়াহোদিন স্টেশনে অন্য একটি ট্রেনে ছিলেন সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ প্রধান ডেভিড পেট্রায়াস। পরে তিনি ঘটনাটিকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন।
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেট্রায়াস বলেন, ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের আতঙ্কিত করার উদ্দেশ্যেই এমন হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বরিস জনসনসহ ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কিয়েভে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলন থেকে ফেরার পথে ছিলেন। তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েলও ছিলেন।
সাবেক সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ডটও ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। বিবিসিকে তিনি জানান, তার ট্রেনের যাত্রীদের প্রথমে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি নিরাপদ বলে জানানো হলে ট্রেনটি আবার যাত্রা শুরু করে এবং নিরাপদে পোল্যান্ড সীমান্তের দোরোহুস্ক স্টেশনে পৌঁছে।
তবে বিল্ডট যে একই ট্রেনে বরিস জনসনের সঙ্গে ছিলেন—এমন কিছু প্রতিবেদনের দাবি থাকলেও জনসন এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত নিশ্চিত করেননি।
হামলার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বরিস জনসন। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে একটি দাঁড়িয়ে থাকা ইউক্রেনীয় ট্রেনের ইঞ্জিনে হামলার অভিযোগ তুলে বলেন, এমন হামলার যুক্তি তার কাছে ‘বিকৃত’ ও ‘অর্থহীন’।
বরিস জনসন বলেন, ইউক্রেনীয়রা প্রতিদিনই এ ধরনের এলোমেলো ও অর্থহীন হামলার শিকার হচ্ছেন, এমনকি বেসামরিক রেলপথও হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
ইউক্রেনের মিত্রদের দ্রুত দেশটিকে প্রয়োজনীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের আহ্বান জানান জনসন।
রাশিয়ার নিয়মিত হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্র দেশগুলোর কাছে আরও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা সরবরাহের আবেদন জানিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও জেটচালিত ড্রোনের ব্যবহার বাড়িয়েছে রাশিয়া।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ইয়াহোদিনে হামলাকে ‘বর্বরোচিত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তার দাবি, ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের এত কাছে হামলা চালানোর মাধ্যমে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘সন্ত্রাস সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর দরজায় কড়া নাড়ছে’।
মস্কোর বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়ে সিবিহা বলেন, রাশিয়ার ‘বর্বরতার’ জবাব কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে দিতে হবে এবং যুদ্ধের ব্যয় মস্কোর জন্য অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
হামলার পর পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক করেন। তিনি বলেন, রাশিয়ার কর্মকাণ্ডের উত্তেজনা ক্রমেই বাস্তবে পরিণত হচ্ছে এবং তা পোল্যান্ডের সীমান্তের আরও কাছে চলে আসছে।
ইউক্রেনের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া দেশটির ট্রেন, রেল ডিপো, জ্বালানি স্টেশন ও সীমান্ত পারাপারের স্থাপনাগুলোকে ক্রমবর্ধমানভাবে লক্ষ্যবস্তু করছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইউক্রেন-মলদোভা সীমান্তের একটি ক্রসিংয়ে রুশ ড্রোন হামলায় দুইজন নিহত হন বলে জানিয়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
এ সপ্তাহেই দক্ষিণ ইউক্রেনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে রুশ ড্রোন হামলায় এক নারী কন্ডাক্টর নিহত হন। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে কিয়েভে একটি রেল ডিপোতে হামলায় উক্রজালিজনিতসিয়ার ছয় কর্মী নিহত হন।
জানুয়ারিতেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে রুশ হামলার নিন্দা জানিয়েছিলেন জেলেনস্কি। ওই ঘটনায় পাঁচজন নিহত হন।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের বিস্তৃত রেল নেটওয়ার্ক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আকাশপথে যাত্রীবাহী বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় লাখো ইউক্রেনীয়র জন্য রেলই এখন প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম।
এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশও নিজেদের ভূখণ্ডে সন্দেহজনক হামলা ও নাশকতার ঘটনায় রাশিয়াকে দায়ী করছে। গত সপ্তাহে জার্মানি অভিযোগ করে, আগস্টে লাইপজিগ বিমানবন্দরে হওয়া ড্রোন হামলার পেছনে রাশিয়ার হাত রয়েছে। তবে মস্কো এ অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইতালি থেকে এস্তোনিয়া পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সামরিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায় সন্দেহজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার কয়েকটির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলো রাশিয়াকে দায়ী করেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক