তাপপ্রবাহে স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যু, দুই কবরে হাত রেখে বিদায় নিলেন সোবহানও
কবরস্থানের নিস্তব্ধতায় দুটি কবরের মাঝে নিথর পড়ে আছেন এক ব্যক্তি। তার একটি হাত রাখা আদরের ছোট ছেলের কবরে, আর অন্য হাতটি ছুঁয়ে আছে স্ত্রীর শেষ শয্যা। ঠিক ১১ দিন আগে যে ট্র্যাজেডির শুরু হয়েছিল, তা কেড়ে নিল পুরো পরিবারের অভিভাবককে। ভারতের উত্তর প্রদেশের মাহোবা জেলার চরখারি শহরে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি এখন পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে। খবর এনডিটিভির।
চলতি তীব্র তাপপ্রবাহে আপনজনদের হারানোর মানসিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে প্রাণ হারিয়েছেন ৪০ বছর বয়সী সোবহান আহমদ। মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে বাবা, মা ও ছোট ভাইকে হারিয়ে এখন সম্পূর্ণ এতিম হয়ে পড়েছে তাদের তিন সন্তান— ১৭ বছরের সাইফ, ১৪ বছরের রোশনি ও ১১ বছরের আলিয়া।
মৃত সুবহান আহমদের মূল বাড়ি মধ্যপ্রদেশের হারপালপুরে হলেও তিনি উত্তর প্রদেশের চরখারি শহরে তার শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছিলেন। গত ২৫ মে শুরু হওয়া তীব্র তাপ্রবাহের কবলে পড়ে সুবহান আহমদের ছয় বছর বয়সী ছোট ছেলে হাসনাইন। প্রচণ্ড গরমে শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে তাকে চিকিৎসার জন্য ছাতারপুরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে মারা যায় হাসনাইন।
ছেলের মৃত্যুর এই আকস্মিক আঘাত সইতে পারেননি মা রাজিয়া খাতুন। সন্তানের মৃত্যুর খবর শোনার পরপরই তিনি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একই দিনে চরখারি শহরের স্থানীয় কবরস্থানে মা ও ছেলেকে পাশাপাশি দাফন করা হয়।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে স্ত্রী ও ছোট সন্তানকে হারিয়ে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন সুবহান আহমদ। বিগত ১১ দিন ধরে তিনি শোকে নিমজ্জিত ছিলেন। গতকাল শুক্রবার (৫ জুন) ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে তিনি স্ত্রী-পুত্রের কবরে জিয়ারত ও প্রার্থনা করার উদ্দেশে ঘর থেকে বের হন।
কবরস্থানে যাওয়ার পর প্রায় দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও সুবহান বাড়ি ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাকে খুঁজতে কবরস্থানে গিয়ে যা দেখেন, তাতে স্তব্ধ হয়ে যান সবাই। সুবহান আহমদ অচেতন অবস্থায় তার স্ত্রী ও সন্তানের কবরের মাঝে শুয়ে আছেন, যার একটি হাত ছেলের কবরের ওপর এবং অন্য হাতটি স্ত্রীর কবরের ওপর রাখা ছিল। সেখান থেকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সুবহানের স্বজনরা জানিয়েছেন, তার পায়ে একটি ক্ষতচিহ্ন দেখা গেছে। যেহেতু তিনি দীর্ঘক্ষণ কবরের পাশে শুয়ে ছিলেন, তাই কোনো বিষাক্ত পোকামাকড় বা সাপ তাকে দংশন করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে স্বজনদের কেউ কেউ বলেন, অতিরিক্ত মানসিক ট্রমা, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া বা শোকও তার মৃত্যুর অন্যতম কারণ হতে পারে।
আত্মীয় মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ২৫ মে তীব্র তাপপ্রবাহে হাসনাইন অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার পর থেকেই সুবহান গভীরভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। শুক্রবার সকালে তিনি কবরস্থানে প্রার্থনা করতে যান। পরে সেখানেই তার লাশ মেলে।
আরেক আত্মীয় হালিম মোহাম্মদ জানান, পরিবারের সদস্যরা যখন খুঁজতে যায়, তখন সুবহানকে কবরের পাশে প্রার্থনার ভঙ্গিতেই মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ঘটনার প্রকৃত রহস্য ও সুবহানের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ ময়নাতদন্তের (পোস্ট-মর্টেম) রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই পরিষ্কার হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক