আটলান্টিকের সেই ক্রুজ শিপে হান্টাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৫
আটলান্টিক মহাসাগরে একটি ক্রুজ শিপে ছড়িয়ে পড়া হান্টাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা এখন নিশ্চিতভাবে পাঁচজন, এছাড়া আরও তিনজনের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে সন্দেহ করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আজ বৃহস্পতিবার (৭ মে) এ তথ্য জানিয়ে সতর্ক করেছে যে, আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
এমভি হোন্ডিয়াস নামের ওই জাহাজে তিনজনের মৃত্যু হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জোর দিয়ে বলেছে, এই প্রাদুর্ভাব কোনো মহামারীর শুরু নয়, কিংবা এটি কোভিড-১৯ এর পুনরাবৃত্তিও নয়। জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংস্থাটি জানিয়েছে, জনস্বাস্থ্যমূলক পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এই প্রাদুর্ভাব সীমিত থাকবে বলে তারা আশা করছে।
জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আটজনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এই আটটি ঘটনার মধ্যে পাঁচটি হান্টাভাইরাস হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বাকি তিনটি সন্দেহজনক।’
গেব্রেয়াসুস আরও বলেন, "এই ক্ষেত্রে জড়িত হান্টাভাইরাসের প্রজাতিটি হলো 'আন্দেস ভাইরাস', যা লাতিন আমেরিকায় দেখা যায়।" তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জাহাজের অবশিষ্ট যাত্রী বা ক্রুদের মধ্যে বর্তমানে কারো কোনো উপসর্গ নেই।’
তবে আন্দেস ভাইরাসের সুপ্তিকাল ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে। এটি মানুষের শরীরে সংক্রমিত হওয়া হান্টাভাইরাসের একমাত্র প্রজাতি। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান সতর্ক করে বলেন, ‘সম্ভবত আরও আক্রান্তের খবর পাওয়া যেতে পারে।’
জাহাজের যাত্রীদের মনোবল বাড়ছে
ডাচ পতাকাবাহী জাহাজটি ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার দক্ষিণ প্রান্তের উশুয়াইয়া থেকে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলের কাছে কেপ ভার্দে যাওয়ার উদ্দেশে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে রওনা হয়। বুধবার এটি কেপ ভার্দে থেকে উত্তরের তেনেরিফের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। এখান থেকে যাত্রীরা নিজ দেশে ফিরতে পারবেন।
তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস জানান, তিনি জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলেন, ‘ক্যাপ্টেন আমাকে জানিয়েছেন যে, জাহাজটি পুনরায় চলতে শুরু করার পর থেকে সবার মনোবল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি সতর্কতা ও সাড়াদান বিষয়ক পরিচালক আবদি রহমান মাহমুদ যোগ বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি জনস্বাস্থ্যমূলক ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা হলে এটি একটি সীমিত প্রাদুর্ভাব হিসেবেই থাকবে।’
এই রোগটি সাধারণত সংক্রমিত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মূত্র, বিষ্ঠা এবং লালার মাধ্যমে ছড়ায়। আন্দেস ভাইরাসের স্ট্রেইনটিই একমাত্র প্রজাতি যার মানুষের থেকে মানুষে সংক্রমণের প্রমাণ রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস জানান, ১ এপ্রিল জাহাজে ওঠার আগে প্রথম দুই আক্রান্ত ব্যক্তি পাখি দেখার জন্য আর্জেন্টিনা, চিলি এবং উরুগুয়ে ভ্রমণ করেছিলেন। আকান্ত ওই ডাচ দম্পতির দুজনেই মারা গেছেন। সেই ভ্রমণে তারা এমন কিছু স্থান পরিদর্শন করেছিলেন যেখানে আন্দেস ভাইরাস বহনকারী বিশেষ ইঁদুরের উপস্থিতি ছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে আর্জেন্টিনার সাথে এই দম্পতির যাতায়াতের পথ চিহ্নিত করতে কাজ করছে। গেব্রেয়াসুস আরও জানান, আর্জেন্টিনা থেকে পাঁচটি দেশের ল্যাবরেটরিতে আড়াই হাজার ডায়াগনস্টিক কিট পাঠানো হবে।
'এটি কোভিড নয়'
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারী প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ বিষয়ক পরিচালক মারিয়া ভ্যান কারখোভ বলেন, ‘এটি কোনো মহামারীর শুরু নয়। এটি কোভিড নয়; এটি ইনফ্লুয়েঞ্জাও নয়—এটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ছড়ায়।’ উল্লেখ্য, কোভিড-১৯ সংকটের সময় সংস্থাটির প্রযুক্তি বিভাগের নেতৃত্বে ছিলেন মারিয়া কারখোভ।
ভাইরাসটির ক্লাস্টারিং প্যাটার্ন বা ধরন বোঝার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইজারল্যান্ড এবং ডাকার থেকে ভাইরাসের পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে।
ভাইরাল হেমোরেজিক ফিভার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আনাইস লেগ্যান্ড জানান, ভাইরাসের আরএনএ উপসর্গ দেখা দেওয়ার প্রথম দিন থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব। সাধারণত ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর উপসর্গ দেখা দেয়।
মারিয়া ভ্যান কারখোভ আরও জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা রোগী এখন আগের চেয়ে ভালো আছেন এবং কেপ ভার্দে থেকে নেদারল্যান্ডসের হাসপাতালে স্থানান্তরিত হওয়া অন্য দুই রোগীর অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক